রিমা বেগম পপি;-বারো তেরো বছরের ছেলে হবে রিফাত। গ্রামে থাকে সে। বাবা খুব ছোট বেলায় মারা গেছেন। আর মা গত দুই বছর যাবত বিছানায় অসুস্থ হয়ে পড়ে আছেন। খুবই কঠিন অসুখ হয়েছে। ডাক্তার বলেছেন খুব বেশি আর সময় নেই। যা যা খেতে চান খাইয়ে দিতে। ডাক্তার এও বলেছেন যে, যত সময় যাবে ওনি ওনার কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলবেন।
রিফাতদের ছোট কুঁড়ে ঘরে মাকে নিয়ে একা থাকে। হঠাৎ একদিন রিফাতের মা আলতো আলতো করে কথা বলেন, ‘বাবা রিফাত আমি মনে হয় আর বেশিদিন বাঁচবোনা। বাবা রে তোকে আমি কার হাতে রেখে যাবো। কে তোর খেয়াল রাখবে।’ এসব বলতে বলতে ওনার কথা আটকে যাচ্ছে। হঠাৎ বললেন, ‘ঠিকমত খেতে দিতে পারিনি। ডাল ভাত ছাড়া একদিনও মাংস খাওয়াতে পারিনি।’ এসব বলার মধ্যেই ওনি ঘুমিয়ে পড়লেন। রিফাত ভাবলো হয়তো মায়ের ইচ্ছে হচ্ছে মাংস খেতে তাইতো মাংসের কথা বলেছেন। রিফাত যেহেতু ছোট মানুষ, তেমন ভারী কাজও সে করতে পারতো না। আশে পাশের কয়েকটা ঘরের বাজার এনে দিত। বাজারএনে দেওয়ার বদলে ওরা তাকে ভাত তরকারী দিত। এই ভাতই মা ছেলে ভাগ করে খেত। যাদের বাসায় রিফাত বাজার এনে দিত ওরাও গরীব। তাই মাংস যে কার কাছে চাইবে বুঝতে পারছেনা। হঠাৎ করে রিফাতের মাথায় বুদ্ধি এলো। আর কয়েক দিন পর তো কোরবানীর ঈদ, তখন অনেক মাংস পাবো। তবে গ্রামে তো কেউই কোরবানী দেয় না। সবাই ছুটে যায় শহরে। এবার না হয় ওদের সাথে আমিও যাবো। এক সময় ঈদের দিন চলে এলো।
ঈদের নামায পড়ে মায়ের সামনে রিফাত কিছু খাবার ও পানি রাখে। তারপর মাকে সালাম করে রিফাত বলে, ‘মাগো আমি গ্রামের সবার সাথে শহরে যাচ্ছি। শুনেছি শহরে নাকি সবাই আজ মাংস বিতরণ করবে। আমি যাই মা। তোমার জন্য আজ মাংস নিয়ে আসবো।’ এই বলে সে চলে গেল সবার সাথে। কিন্তু একটা আশ্চর্যের বিষয় হলো ঈদের দিন সবাই মাংস এক ভাগ গরীবদের বিলিয়ে দিচ্ছিল, অথচ রিফাত মাংস নিতে পারছেনা। সে ছোট তো তাই সবাই ওকে পেছনে ফেলে ওরাই মাংস নিতে যাচ্ছে। যখন রিফাতের ব্যাগ সামনে আসে তখনই বিতরণের মাংস শেষ হয়ে যায়।
এভাবে নিয়তি রিফাতকে অনেক পেছনে ফিরিয়ে দেয়। অনেক কষ্টের পর মোটামুটি মাংস পেল রিফাত। রিফাত মনে মনে ভাবে এতো মাংস দিয়ে সে কি করবে। তাছাড়া রান্না করার মত মসলাপাতিও ঘরে নেই। রিফাত দেখে যে রাস্তায় কিছু মানুষ মাংস বিক্রি করছে। তাই রিফাত মাংসগুলো নিয়ে সেখানে যায়। কিছু মাংস তার জন্য রেখে বাকিগুলো বিক্রির জন্য দেয়। বিক্রি করে সামান্য কিছু টাকা পায় সে। তা দিয়ে ওর বাড়ি ফেরা আর কিছু মসলাপাতির ব্যবস্থা করে। মাংস বিক্রি করতে গিয়ে রিফাতেরগ্রামের লোকেরা চলে গেলেন তাকে একা রেখে। এখন সে কিভাবে যাবে। গাড়ি যা পায় তাও যাত্রীতে ভরা। বাসের ছাদেও জায়গা পায়নি রিফাত। অনেক সময় দাঁড়িয়ে একটা গাড়ি পায়। গাড়িতে একদম বসার সিট নেই। ছাদে কোন রকম বসে যেতে পারবে। তাতেই উঠে গেল সে। কারণ যে করেই হোক ওকে বাড়ি ফিরে মাকে মাংস রান্না করে খাওয়াতে হবে। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস রিফাতের আর বাড়ি ফেরা হলোনা। এক নিমিষেই সবকিছু শেষ হয়ে গেল। অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে বাসে উঠাতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায় গাড়িটি। বাসটি খাদে পড়াতে রিফাত ছাদে থাকার কারণে ওপর থেকে হোঁচট খেয়ে নিচে পড়ে যায়। আশ্চর্যের বিষয় রিফাত মায়ের জন্য মাংসের ব্যাগটা হাতেই রেখে দেয়। আর সেই ব্যাগের সাথে সাথে সেও পানিতে পড়ে যায়। ব্যাগের ভারে রিফাতও তলিয়ে যায়। বাসটি খাদে পড়াতে আশেপাশের সবাই ছুটে আসলেন উদ্ধার করতে। অনেকেই আহত হয়েছেন, অনেকেই আবার মারা গেছেন। আর সেই অনেকের মাঝে রিফাতও ছিল। মৃত্যুর পরও রিফাতের হাতে মাংসের ব্যাগটা রয়ে গেল। লাশের সারীতে রিফাতের লাশটা রয়েছে। এলাকার একজন রিফাতকে চিনতে পেরে লাশ নিয়ে বাড়িতে এলেন আর রিফাতের মাকে খবর দিলেন।
রিফাতের মা অসুস্থতা নিয়েও ঘর থেকে দৌড়ে বের হলেন, ছেলের হাতে মাংসের ব্যাগ দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। চিৎকার দিয়ে বলতে লাগলেন, ‘বাবা রে আমার বাবা তুই মাকে মাংস খাওয়াবিনা, চোখ খোল বাবা, আমি তোর মুখ থেকে মা ডাক শুনতে চাই। ওরে আমার বাজান কথা কয়না কেনে। আজ তো ঈদ। ঈদের দিনে আমার বাজান আমার লগে রাগ করছেনি।’ মায়ের কান্নায় আকাশ যেন ভারী হয়ে গেল। চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে রিফাতের মায়ের মুখ থেকে রক্ত বেরিয়ে আসে। ছেলের শোকে মাও না ফেরার দেশে চলে গেলেন।
মায়ের ইচ্ছে
168
