লাকী আক্তার : ব্রাজিলের পশ্চিম পারানায় ‘ভূমিহীনদের গ্রামীণ আন্দোলন’-এর সূচনা হয় মূলত ১৯৮৪ সালের দিকে। পরবর্তীতে এই আন্দোলনের রেশ ছড়িয়ে পড়ে ব্রাজিলের বিভিন্ন স্টেটে। এখনো বিভিন্ন স্টেটে এই আন্দোলন চলছে। ব্রাজিলের রাজনীতিতে উগ্র ডানপন্থি বলসানরো ক্ষমতায় আসার কারণে এই আন্দোলন হুমকির মধ্যে পড়েছে। ক্ষমতায় এসেই বলসানরো ‘ভূমিহীন গ্রামীণ আন্দোলন’-এর কর্মীদের ওপর চড়াও হচ্ছেন, হত্যা করছেন। তবুও যেসব সেটেলমেন্ট বছরের পর বছর ধরে বিকল্প সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করার সাহস দেখিয়েছেন, তারা লড়ে যাচ্ছেন। ব্রাজিলের পশ্চিম পারানায় কৃষকদের সংগঠিত এবং সামষ্টিক ভিত্তিতে চাষাবাদ এবং চাষাবাদের বিকল্প পদ্ধতির মধ্য দিয়ে মূলত তারা বিকল্প কৃষি ভাবনার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। ২০১৮ সালের নভেম্বরের ৩ তারিখ, ব্রাজিলের সাওপাওলোর দূরবর্তী গ্রাম গুয়ারারেমার ৩৬ দিনের শিক্ষা গ্রহণের এক ফাঁকে, তিন দিনের একটা ঝটিকা সফরে পারানার ঐতিহ্যবাহী
কৃষি সেটেলমেন্টগুলো দেখতে গিয়েছিলাম। এই সেটেলমেন্টগুলো ব্রাজিলের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার জন্য ব্যবহার করে থাকে। এই সেটেলমেন্ট এবং কো-অপারেটিভের সঙ্গে ইউনিভার্সিটি অব পারানারও যৌথ অংশীদারিত্ব রয়েছে।
কৃষি সেটেলমেন্টগুলো মূলত কৃষিগ্রামের মতো। সামষ্টিক উৎপাদন এবং পরিকল্পিত বণ্টন পদ্ধতির মধ্য দিয়ে মূলত এই কৃষি সেটেলমেন্টগুলো পরিচালিত হয়ে থাকে। এই মডেলে কাজ শুরু করতে হয়েছে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। পূর্বে মূলত সামন্তদের হাতে এই জমিগুলো ছিল। পরবর্তীতে ‘ভূমিহীনদের গ্রামীণ আন্দোলন’-এর তীব্রতায় সরকার বাধ্য হয়ে অনেক জমি ভূমিহীনদের হাতে তুলে দেয়। এর মধ্যেই এই আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ যারা সমাজতান্ত্রিক আদর্শের উত্তরসূরি তারাই মূলত সামষ্টিক উৎপাদন পদ্ধতির উৎপাদনের এই কাঠামো গড়ে তোলেন। মানুষের দৈনন্দিন জীবন এবং উৎপাদনকে সামাজিকভাবে সংগঠনের মাধ্যমে কীভাবে পরিচালনা করা যায় তার একটা চিত্র এখানে দেখে এলাম।
আমরা যে সেটেলমেন্টে গিয়েছিলাম এই সেটেলমেন্টের উৎপাদন এবং বণ্টন কো-অপারেটিভের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই কো-অপারেটিভ এর নাম হলো ‘টেরা লিভ্রে’ মানে ‘মুক্ত ভূমি’। কো-অপারেটিভগুলো চলে মূলত রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। এই কো-অপারেটিভে নারী এবং পুরুষের অনুপাত প্রায় সমান সমান। কো-অপারেটিভের মাধ্যমে তারা তাদের উৎপাদিত পণ্যের দাম পাচ্ছেন তাদের নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মধ্য দিয়ে। নারীরা অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে এখন অগ্রগামী। এ ছাড়া কো-অপারেটিভ ছাড়াও এখানে আলাদা নারী কো-অপারেটিভ রয়েছে। কৃষি উৎপাদন বাড়ার পেছনে রয়েছে এখানকার নারীদের ব্যাপক ভূমিকা। তাদের উৎপাদিত পণ্যের একটা বড় অংশই অর্গানিক এগ্রোইকোলজিক্যাল সিস্টেমের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। এই সেটেলমেন্টের উৎপাদিত কীটনাশকমুক্ত খাবার সরবরাহ করা হয় মূলত
স্কুলগুলোয়। উল্লেখ্য, ব্রাজিলের সরকারি স্কুলগুলোতে বাচ্চাদের জন্য মিড-ডে মিলের ব্যবস্থা রয়েছে। ব্রাজিলে বামপন্থি সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই সেটেলমেন্টের উৎপাদিত পণ্য এসব স্কুলে সরবরাহ করা হতো। কারণ হিসেবে বলা হয়, শিশুরা বিষমুক্ত খাবার গ্রহণ করলে, প্রজন্ম সুরক্ষিত থাকবে। তা ছাড়া যারা উৎপাদন করছেন তাদের বিক্রয় নিয়েও চিন্তা করতে হয় না। তারা শুধু উৎপাদন করেন এবং সেই কৃষি পণ্য তারা কো-অপারেটিভে পৌঁছে দেন। কো-অপারেটিভের দায়িত্ব হচ্ছে এই খাদ্য নির্দিষ্ট স্কুলে পৌঁছে দেওয়া। প্রতি সপ্তাহে তারা গড়ে ১০ টন শস্য উৎপাদন করেন, এই খাদ্য তারা পারানার ১২৪টি স্কুলে পৌঁছে দেন। তবে এর মধ্যে কিছু ব্যতিক্রমও রয়েছে। কিছু কিছু সেটেলমেন্টে অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হয় না। তাদের এই কৃষি পণ্য চলে যায় স্থানীয় বাজারে। এই কো-অপারেটিভ ১০টি ভিত্তি গ্রুপের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। এ ছাড়া এই কো-অপারেটিভ নিজস্ব পদ্ধতিতে জ্যাম-জেলি উৎপাদন এবং প্রক্রিয়াজাতও করে থাকে। যদিও গুণগত মান রক্ষায় এখনো কোনো শক্তিশালী ব্যবস্থা তারা গ্রহণ করতে পারেনি।
পারানার পশ্চিম দিকের এই সেটেলমেন্টগুলোতে উৎপাদনের সঙ্গে ১৩০টি পরিবার জড়িত। বলা বাহুল্য বেশির ভাগ পরিবারই ২-৪ জনের পরিবার। প্রায় প্রত্যেক পরিবারের নামেই ১০-২০ একর জমি বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে। এই সেটেলমেন্টের একটা পরিবারে গিয়েছিলাম । যারা প্রায় ২০ বছর ধরে এখানে আছে। বলা যায় মূলত সেটেলমেন্টের শুরুর দিকেই তারা এসেছেন এখানে। যখন তারা এখানে এসেছিলেন তখন তারা ছিলেন বয়সে তরুণ। তাদের নাম এন্থনিও এবং এন্থনিয়া। এদের যুগল জীবনের ৩৬ বছরের ২০ বছর তারা এখানেই অতিবাহিত করেছেন।
প্রথম থেকেই স্বামী-স্ত্রী মিলেই এই জমি চাষাবাদ করতেন। এখন তাদের পুত্রসন্তান তাদের সঙ্গে কাজ করেন। প্রথম দিকে এই ১০ একর জমির অনেকটাই ছিল অনাবাদি। তারা মূলত একটি সুপরিকল্পনা এবং অধিক শ্রমদানের মাধ্যমে এই জমিকে বাসযোগ্য করেছেন। এখন এটাকে একটা সুপরিকল্পিত খামার মনে হয়। তারা নিজেদের ঘরের আশপাশে নানান ধরনের ফুল এবং ফলগাছ লাগিয়েছেন। অর্গানিক এগ্রোইকোলজির ভিত্তিতে চাষাবাদ করছেন। এখানে একই সঙ্গে শিম (ব্রাজিলিয়ান কালো এবং সাদা), নানান সবজি, লেটুস, গাজর, মিষ্টিকুমড়া, ফল তারা চাষাবাদ করে থাকেন। খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে তারা তাদের দেশীয় বীজ এবং ফসলগুলোকেই বেছে নিয়েছেন।
এই সেটেলমেন্টগুলো দেখতে গিয়ে একটা বিষয়ের প্রতি আমার চোখ আটকে গেল, সেটা হলো সেটেলমেন্টের আশপাশে প্রচুর ইউক্যালিপটাস গাছের সারি। কীভাবে এগ্রোইকোলজির মধ্যে তারা ইউক্যালিপটাস রেখেছেন এটা নিয়ে আমার মধ্যে একটু বিরূপ প্রতিক্রিয়া হলো। আমি ইউক্যালিপটাস গাছের ক্ষতিকারক দিকগুলোর কথা এন্থনিওকে জিজ্ঞেস করলাম। তখন তিনি বললেন, আমাদের এখানেও এটা নিয়ে মত ভিন্নতা রয়েছে। আমরা মূলত এই গাছটি লাগিয়েছি কাঠের জন্য। এটা দ্রুত বর্ধনশীল গাছ। তবে আমরা এর ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য আশপাশে প্রচুর ফুল এবং ফলের গাছ লাগিয়েছি। তখন আমি তাদের বললাম দ্রুত বর্ধনশীল আরও অন্য জাতের গাছ লাগানোর বিষয় নিয়ে তারা ভাবতে পারেন। বিকালে তাদের ইউনিভার্সিটির এক ছাত্রের সঙ্গে আলাপচারিতায় বুঝতে পারলাম, তাদের মধ্যেও এ বিষয় নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক চলছে। এই বড় খামারগুলো মূলত বড় বৃক্ষবিহীন খামার। এখানে পানির সংকট রয়েছে। তবে পানির সরবরাহের জন্য তারা নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তারা একটি গভীর কুয়া খনন করেছেন। এ ছাড়া বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থাও করেছেন। এন্থনিওদের খামারে কৃষিশস্য উৎপাদনের পাশাপাশি তারা গরু,
ছাগল, শূকরও পালন করেন। এদের বিষ্ঠা দিয়ে সার উৎপাদন করে সেগুলো আবার ফসলের খেতে প্রয়োগ করেন। তারা সবাই নিজস্ব জাতের বীজ উৎপাদন করেন এবং সংগ্রহ করে থাকেন। আমরা তাদের সংরক্ষিত বীজগুলো হাতে নিয়ে দেখলাম। তারা মনে করেন নিজস্ব জাতের বীজ সংরক্ষণ একটা ঐতিহাসিক রাজনৈতিক লড়াই। এটি করপোরেট বীজ কোম্পানিগুলোর আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই। এ ছাড়া এই সমবায়ের তত্ত্বাবধানে স্কুল, কলেজ, হাসপাতালও রয়েছে। এ ছাড়া গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি বিকাশের জন্য এখানে একটি আর্ট সেন্টারও রয়েছে এবং এসব কিছুই স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে, সংহতি এবং কমিউন ধারণার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়ে থাকে। এখানকার কৃষি উৎপাদনের যন্ত্রপাতিও সবাই সম্মিলিতভাবে ব্যবহার করে থাকেন।
এই কো-অপারেটিভের সদস্যদের নিয়মিত রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। তারা মনে করেন এটি শুধু বিকল্প উৎপাদনের এবং বণ্টনের সংগ্রাম নয়, এটি বিকল্প রাজনৈতিক দর্শনের বাস্তব প্রয়োগের দৈনন্দিন লড়াই। দেখতে দেখতেই ভাবছিলাম আমাদের দেশের হতভাগা কৃষকদের কথা। যারা উৎপাদন করেন কিন্তু লাভজনক দাম তো দূরে থাক, তারা ন্যায্যমূল্যও পান না। এমনকি শুধু ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়ার দরুন কৃষি ক্ষেত্রে আগ্রহ হারিয়ে বিকল্প পেশার দিকে ঝুঁকছেন কৃষক। পুরো কৃষি ব্যবস্থার বণ্টন, বিপণন লুটেরা সিন্ডিকেটের হাতে বন্দী। কৃষকের মুক্তির জন্য ভূমি সংস্কার করে উৎপাদন, বণ্টন এবং বাজারে সরাসরি কৃষকের অংশগ্রহণ ছাড়া ভিন্ন কোনো উপায় নেই। এ জন্য জোরদার রাজনৈতিক লড়াই করতে হবে। ব্রাজিলের পারানার সেটেলমেন্টের কৃষকদের ফসলের মাঠে রাজনৈতিক লড়াই আমাদের আশাবাদী করে।
লেখক : কৃষক নেত্রী- নির্বাহী সদস্য, বাংলাদেশ কৃষক সমিতি । সাবেক সভাপতি- ছাত্র ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় কমিটি ।
