তুফ্ফাহুল জান্নাত মারিয়া: মসজিদের সিঁড়ি থেকে পাঁচ জোড়া জুতো চুরি হয়েছে শুধু তাই নয় মসজিদের পাশের একটি বাড়ির জানালার কাঁচ ইট দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে।
আরও দুই বাড়ি থেকে গাছের ফল চুরি হয়েছে। এলাকাবাসীর ধারণা, কেউ তারাবী নামাজ পড়তে এসে এমন কান্ড ঘটিয়ে গেছে।
মসজিদের ইমাম সাহেব ঘটনা শুনে ভীষণ মর্মাহত হয়েছেন৷ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভাবলেন মানুষের নৈতিকতা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে?
আরও সাত পাঁচ ভাবছিলেন তিনি৷
মসজিদে একদল ছোট্ট বাচ্চারা কোরআন শিখতে এসেছে৷ ওরা সুর করে পড়ছে আলহামদুলিল্লাহি রাব্বীল আল-আমিন….
ইমাম সাহেব মিজানকে কাছে ডাকলেন।
মুয়াজ্জিন মিজান ছোট বাচ্চাদের কোরআন শেখান। মিজানের বয়সও কম, বিশ / একুশ বছর।
ইমাম সাহেব ভ্রূ কুঁচকে মোটামুটি রাগত স্বরে বললেন, তোমার উপর যে আমি বিরক্ত তা কি তুমি জানো?
তুমি নাকি বাচ্চাদের প্রচুর পেটাও? একটা ছোট বাচ্চাকে আচ্ছামত পিটিয়েছো?
মিজান নরম গলায় উত্তর দিল, পড়া না পারলে পেটাব না?
ইমাম সাহেব কঠোর গলায় বললেন, বাচ্চাটির বাবা আমাকে জানিয়েছেন ওর ভীষণ জ্বর এসেছে পিটুনি খেয়ে। ও আর আসবে না।
তোমাকে এভাবে পিটিয়ে বাচ্চাদের শেখাতে কে বলেছে?
ছোট শিশুরা কত আগ্রহ ভরে আল্লাহর কালাম শিখতে এসেছে আর তুমি ওদের ভেতর ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছো? ওরা স্বভাবসুলভ দুষ্টুমি করবেই, পড়া ভুলে যাবে, বারবার জিজ্ঞেস করবেই। এত রাগ নিয়ে তোমাকে বাচ্চাদের পড়াতে হবে না৷
মিজান কাঁচুমাচু করে বললেন, ভুল হয়ে গেছে।
–অবশ্যই ভুল হয়েছে। আমাদের প্রিয় নবী (সা) যখন সিজদাহ দিতেন তখন তাঁর ছোট দুই নাতী হাসান, হোসাইন তাঁর পিঠে চড়ে বসে থাকতেন। ঘোড়া বানিয়ে দাপিয়ে বেড়াতেন। নবী কারীম ( সা) অপেক্ষা করতেন কখন তাঁরা স্বেচ্ছায় পিঠ থেকে নেমে যান তবুও তিনি এতটুকু ধমক পর্যন্ত দেননি ।
একজন সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হয়েও তিনি শিশুদের প্রতি কক্ষণো কঠোর আচরণ করেননি আর একজন সামান্য মানুষ হয়ে তুমি এত কঠোর আচরণ করলে কীভাবে?
ইমাম সাহেব নরম স্বরে বললেন, শোনো মিজান আল্লাহর কালাম যাঁরা মন থেকে ভালোবাসতে পারেন তাঁরা সেটি আজীবন ধারণ করেন। সাময়িক ভয় দেখিয়ে শেখালে তা পরবর্তীতে প্রত্যাখ্যানের আশঙ্কাই বেশি৷ ইসলামিক দেশগুলোতে দেখো শায়খগণ হেসে খেলে বাচ্চাদের শেখান। কী চমৎকার তাঁদের শিক্ষণ!
ইমাম সাহেবকে বাসায় দাওয়াত দিয়েছেন শওকত আলী। রাতে খেতে বসেছেন তাঁরা। একজন কিশোর খাবারের বাটি এগিয়ে নিয়ে আসছে। ওকে দেখেই ইমাম সাহেব আদর করে কাছে বসালেন। কী নাম যেন তোমার বাবা?
কিশোর উত্তর দিল, সাইয়্যেদ
ইমাম সাহেব আবার জিজ্ঞেস করলেন, সাইয়্যেদ অর্থ কি তুমি জানো?
সাইয়্যেদ মাথা নেড়ে বলল, জ্বি জানি৷ সাইয়্যেদ অর্থ দলনেতা।
সাইয়্যেদ এবার অষ্টম শ্রেণিতে উঠেছে। ইমাম সাহেব ওর সাথে আরও অনেকক্ষণ গল্প করলেন। ওর মাথায় হাত রেখে বললেন তুমি হবে ভালো কাজের দলনেতা।
দুইদিন পরের ঘটনা, তারাবী শেষে সাইয়্যেদ যখন বাসায় এলো তখন ওর মা প্লেটে খাবার দিতে দিতে বললেন, আজ সারাদিন তুমি কী কী ভালো কাজ করেছো?
সাইয়্যেদ অনেকক্ষণ ভেবে বলল, পথে একজন অন্ধ ভিখারী বসেছিলেন তাকে পাঁচ টাকা দিয়েছি।
মরিয়ম বেগম ভীষণ খুশি হলেন। কারো কোনো ক্ষতি করোনি তো?
সাইয়্যেদ না সূচক মাথা নাড়লো।
এভাবে প্রতিদিন মরিয়ম বেগম ছেলেকে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা শুরু করলেন। সাইয়্যেদ দুই একটা ভালো কাজের কথা মাকে বলত।
চতুর্থ দিন যখন একইভাবে জিজ্ঞেস করলেন কারো ক্ষতি করেছে কিনা তখন সাইয়্যেদ চুপ করে বসে রইল।
মরিয়ম বেগম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, তুমি যে মানুষের ক্ষতি করেছো তা কিন্তু তোমার বাবা এবং আমি জানি। মসজিদ থেকে তোমরা পাঁচ বন্ধু মিলে জুতো চুরি করেছো। ঢিল দিয়ে কাঁচ ভেঙেছো। ফল চুরি করেছো। এই কথা কে বলেছে জানো? সেদিন ইমাম সাহেব এসেছিলেন তিনি বলে গেছেন। তোমরা নামাজের নাম করে বাইরে গেছো কিন্তু মসজিদে যাওনি।
তোমার বাকি চার বন্ধুকে রাতে খাবার জন্য আমি দাওয়াত দিয়েছি। ইমাম সাহেবও আসবেন তোমাদের যেন কোথায় নিয়ে যাবেন।
রাতের বেলা সাইয়্যেদের চার বন্ধু এলো। কিছুক্ষণ বাদে ইমাম সাহেবও এলেন।
সাইয়্যেদ মুখ কাঁচুমাচু করে বসে আছে।
ইমাম সাহেব ওদের সালাম দিলেন এবং বললেন তোমরা যে মুসল্লিদের জুতো নিয়ে মসজিদের পেছনের জঙ্গলে ফেলে দিয়েছো তা আমি জানি। মসজিদের বারান্দায় সিসিটিভি আছে। তোমাদের পাঁচজনকে একটা জায়গায় আমি নিয়ে যাব।
পাঁচজনই ভয়ে কুঁকড়ে গেছে। ইমাম সাহেব ওদেরকে হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডে নিয়ে এসেছে। সেদিন ওরা যে ঢিল ছুঁড়ে জানালার কাঁচ ভেঙেছে এতে একটা বাচ্চাটি কপাল কেটে গেছে। ইমাম সাহেব বাচ্চাটির কাছেই ওদের নিয়ে এসেছে। বাচ্চাটিকে স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছে৷
ওরাই যে এর জন্য দায়ী সেই কথা ইমাম সাহেব শিশুটির মা- বাবাকে বলেননি।
এবার হাসপাতাল থেকে ফিরে আসার সময় ইমাম সাহেব বললেন, তোমাদের কি মনে হচ্ছে তোমরা ঠিক করেছো নাকি অন্যায় করেছো?
ওরা সমস্বরে বলল, অন্যায় করেছি।
— অবশ্যই অন্যায় করেছো। এই বাচ্চাটি তো মারাও যেতে পারতো তাই না? এখন সে আহত অবস্থায় কতটা কষ্ট পাচ্ছে ভেবে দেখো তো।
আমি চাইলে তোমাদের হেডমাস্টারের কাছে বিচার দিতে পারতাম। এলাকাবাসীর সামনে কঠোর শাস্তি দিতে পারতাম কিন্তু আমি চেয়েছি তোমরা অনুভব কর যে কতটা মারাত্মক অন্যায় করেছো এবং সেই অন্যায় যাতে আর কখনও না করো।
তোমাদের মা – বাবাকে বিষয়টি জানিয়েছি সাথে এটাও বলেছি যাতে তোমাদের কঠোর সাজা না দেয়। ক্ষতিগ্রস্তদের যেন ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেন আর প্রতিদিন যেন জিজ্ঞেস করেন তোমরা কী কী ভালো কাজ করেছো।
যাদের জুতো জঙ্গলে ফেলে এসেছো তাদের প্রত্যেকের কাছে ক্ষমা চাইবে এবং জুতো ফেরত দিবে।
তখন নাঈম আমতা আমতা করে বলে উঠলো, যদি তারা আমাদের বকা দেন, পিটুনি দেন তাহলে?
ইমাম সাহেব তখন ওর মাথায় হাত রেখে বললেন, আল্লাহ যদি মানুষকে ক্ষমা করে দিতে পারেন তাহলে মানুষেরও উচিত কেউ ভুল বুঝে ক্ষমা চাইলে ক্ষমা করে দেয়া। তুমি মানুষের ভয়ে এত আতঙ্কিত হচ্ছো তাহলে ভেবে দেখো যিনি আমাদের সমস্ত অন্যায় দেখেন এবং যাঁর কাছে আমাদের সবকিছুর হিসেব দিতে হবে তাঁর ভয়ে আমাদের কতটুকু আতঙ্কিত থাকা উচিত।
নাঈম চুপ করে রইলো সেই সাথে বাকি সবাই।
ইমাম সাহেব বললেন , ছোট বেলায় আমিও ভীষণ ডানপিটে ছিলাম। মাদ্রাসা থেকে পালাতাম৷ পাখির পায়ে সুতো বেঁধে খেলতাম। ফাঁদ পেতে বিড়াল ধরতাম। আরও কত কী!
আমরা মানুষ মাত্রই ভুল করি বিধায় আমাদের বারবার ক্ষমা চাইতে হয়। আমাদের পরিশুদ্ধির জন্য বিশেষ কিছু মাস, বিশেষ কিছু দিন আমাদের কাছে আসে। পবিত্রতম সেইসব দিনগুলোতে নিজেদের পাপের কথা স্মরণ করে বিশেষভাবে ক্ষমা চাইতে হয়। এই যেমন রমজান এসেছে। বুঝতে পেরেছো?
বালকেরা দল বেঁধে তারাবী পড়তে আসে। বাসায় যাওয়ার পর প্রত্যেকের মা- বাবা জিজ্ঞেস করেন আজ তারা কী কী ভালো কাজ করেছে। কারো কোনো ক্ষতি করেছে কিনা।
ইমাম সাহেব খুতবায় বলেছেন, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য দেখানো যেমন ধর্ম একই সাথে তাঁর সমগ্র সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা দেখানোও ধর্মেরই বিধান। মুসলিম বা অমুসলিম কেউ যেন বিন্দুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এমনকি পশু – পাখিও যেন তার কাছে নিরাপদে থাকে সেই শিক্ষাদানও মা- বাবা তার সন্তানকে শেখাবেন গুরুত্বের সাথে।
কিছুদিন পর নামাজ শেষে ইমাম সাহেব বাড়ি ফিরছিলেন খেয়াল করলেন ম্যানহোলের ভেতর থেকে ওরা একটা বিড়ালছানাকে টেনে তুলছে। সাইয়্যেদ বিড়ালছানাটিকে কোলে তুলে নিল। ইমাম সাহেব মুচকি হেসে বললেন, এই যে আবু হুরায়রা৷ আবু হুরায়রা মানে কি জানো?
সাইয়্যেদ মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ জানি৷ আবু হুরায়রা মানে বিড়ালের বাবা।
বালকের দল এই কথা শুনে হেসেই কুটিকুটি৷ জলে ভেজা একটা বিড়ালছানাকে কোলে তুলে ওরা বাসার দিকে রওনা হল। মা- বাবাকে নিশ্চয়ই বলবে আজকের একটা ভালো কাজ হলো বিড়ালছানা উদ্ধার।
মসজিদ থেকে তখন ভেসে আসছিল, আর রাহমান আল্লামাল কুরআন খালাকাল ইনছা-ন আল্লামাহুল বায়ান….
তাঁর মনটা ভীষণ ভালো হয়ে গেছে । একদল পরিশুদ্ধ বালকের চলে যাওয়া পথের দিকে ইমাম সাহেব অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। বাইরে কী চমৎকার বাতাস! মসজিদের পাশ থেকে হাসনাহেনার ঘ্রাণে চারদিক সুরভিত। তার চেয়েও বেশি সৌরভ ছড়িয়ে গেছে পরিশুদ্ধ একদল কিশোর।
লেখক:শিক্ষার্থী-উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
