ফজলে রাব্বী সাজু: উত্তর পূর্ব সিলেটের সীমান্তবর্তী এলাকা জৈন্তিয়া রাজ্য অার সারিনদীর পাড়ে অবস্থিত এক জনপদের নাম জৈন্তাপুর। ইতিহাস ঐতিহ্যে ভরপুর এ জৈন্তিয়া জনপদের দিগারাইল গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ধনাঢ্য পরিবারে ১৯৭৯ সালের মার্চ মাসে মোহাম্মদ গোলজার আহমদ হেলাল’র জন্ম। সম্পর্কে অামার ফুফাতো (অাপন) বোন জামাই।
গোলজার আহমদ হেলাল’র পিতা মরহুম মুহিবুর রহমান ছিলেন একজন ধর্মভীরু অার ইসলামপ্রিয় মানুষ। ধন-দৌলতে ভরপুর এ পরিবার ছিলো দিগারাইল গ্রামের এক অালোকবর্তিকা স্বরুপ৷ সালিসী সহ সকল প্রকার ন্যায্য বিচারে দিগারাইল গ্রামের এ পরিবারটি ইতিহাস ঐতিহ্যের স্বাক্ষর রেখেছিল।
বাবার অনুপ্রেরণায় পারিবারিক শিক্ষা নিয়ে গোলজার অাহমদ হেলাল ভর্তি হন গ্রামের দিগারাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১ম থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত অত্যান্ত দক্ষতা অার মেধার বলে শেষ করেন প্রাথমিক শিক্ষা। তখনকার সময়ে গোলজার অাহমদ হেলাল ৫ম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুল বৃত্তি লাভ করেন। তৎকালিন সময়ে স্কুল লেভেলে জেলা পরিষদের মূল্যায়ন পরীক্ষায় তিনি ট্যালেন্টপুল বৃত্তিপ্রাপ্ত হয়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। প্রাথমিকের পাঠ শেষ করে গোলজার অহমদ হেলাল ভর্তি হন জৈন্তাপুর উপজেলার শ্রেষ্ট বিদ্যাপীঠ হিসেবে খ্যাত সেন্ট্রাল জৈন্তা উচ্চ বিদ্যালয়ে।
প্রাথমিকে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল নিয়ে অাসা এ মানুষটি শুরুর দিক থেকেই নজর কাড়েন শিক্ষক-শিক্ষিকার ; হয়ে উঠেন ভালো ছাত্র হিসেবে। শিক্ষকদের সঠিক মূল্যায়ন অার তাঁর পরিশ্রমের বল নিয়ে সামনে যেতে থাকেন। প্রতি শ্রেণিতে গোলজার অাহমদ হেলাল ১ম মেধাতালিকায় স্থান নিয়ে বড় হতে থাকেন। ৮ম শ্রেণির জুনিয়র স্কলারশিপ পরীক্ষায় সাধারণ গ্রেডে বৃত্তিপ্রাপ্ত হয়ে সেন্ট্রাল জৈন্তায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে মরহুম অাব্দুর রহিম স্যার সহ অারো অনেকেই খুব কাছের ছিলেন। জুনিয়র বৃত্তির মেধাতালিকায় গোলজার অাহমদ হেলাল’র নাম দেখে তাঁর প্রতি অারো টনক নড়ে শিক্ষকদের। হয়ে উঠেন খুব কাছের ছাত্র, তিনিও স্বপ্ন দেখতে থাকেন বড় হওয়ার, অাদর্শ মানুষ হওয়ার। দিগারাইল গ্রাম থেকে উঠে অাসা এ মানুষটি অাজ সত্যিই বড় হয়েছে। ৯ম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে একই স্কুলে (সেন্ট্রাল জৈন্তা উচ্চ বিদ্যালয়) সেরাদের স্বাক্ষর রাখেন। গোলজার অাহমদ হেলাল মেট্রিকুলেশন (এস.এস.সি) পরীক্ষায় চার বিষয়ে লেটারসহ স্টারমার্কস -১ম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। তখনকার সময়ে জৈন্তাপুর’র যে কয়জন মেধাবী অার ভালো ছাত্র-ছাত্রী ছিলেন গোলজার অাহমদ হেলাল তাঁদেরই একজন।
সেন্ট্রাল জৈন্তা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অাদর্শে উজ্জীবিত এ মানুষ এস.এস.সি উত্তীর্ণের পর ভর্তি হন সিলেটের অক্সফোর্ড খ্যাত প্রতিষ্টান, শত বছরের ঐতিহ্যের স্মারক এমসি কলেজে (মুরারিচাঁদ কলেজ)। ভর্তি হন উচ্চ মাধ্যমিক পাঠদানে৷ প্রিয় শিক্ষকদের পরামর্শে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে শুরু করেন শহুরে জীবন অার লেখাপড়ার জগতে হারিয়ে যাওয়া এক নিরব নিভৃতচারী স্বপ্নপুরুষ। এমসি কলেজ হোস্টেল ছিলো তাঁর ২য় ঘর; সেখান থেকেই পাঠদান করতেন এমসি কলেজে৷ গ্রামের স্কুল থেকে তৎকালিন সময়ে এস.এস.সি’র এরকম রেজাল্ট নিয়ে এমসি কলেজে ক’জনই বা ভর্তি হতে পারেন ?
জৈন্তাপুর’র সেন্ট্রাল জৈন্তা উচ্চ বিদ্যালয়ের এ ছেলেটার এ রকম কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল দেখে এমসি কলেজ প্রধান বাহবা দিতে থাকেন অার শিক্ষকদের ভূয়সি প্রশংসা করেন। গোলজার অাহমদ হেলাল এমসি কলেজেও কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল করেন। উচ্চ মাধ্যমিকের পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ডিস্টিংশনসহ (এইচ.এস.সি) ১ম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। উচ্চমাধ্যমিক পাশের পর গোলজার অাহমদ হেলাল বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষার জন্য ভর্তিযুদ্ধের অগ্রণি সৈনিক হিসেবে ভূমিকা রাখেন।
১৯৯৫-১৯৯৬ সেশনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে “ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি “বিষয়ে মেধাতালিকায় চান্সপ্রাপ্ত হন৷ বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়ুয়া মানুষজন একটু জেদী প্রকৃতির হয়, গোলজার অাহমদ হেলালও তাই-ই ছিলেন হয়তোবা। ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে পড়ার অাগ্রহ নেই যে তাঁর৷ পরবর্তীতে গুরুজনদের পরামর্শ, পরিবার অার সিলেট’র কথা চিন্তা করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হয়ে এমসি কলেজ(বিশ্ববিদ্যালয়) গণিত বিভাগে অনার্সে ভর্তি হন। শুরু করেন উচ্চতর পড়াশোনা।
এমসি কলেজে অধ্যয়নকালিন সময়ে গোলজার অাহমদ হেলাল জড়িয়ে পড়েন ছাত্র রাজনীতিতে। তখনকার সময়ে ছাত্ররাজনীতির নামে কোন কলংক ছিলো না, ছিলো না কোন হানাহানি, রাহাজানি, চাঁদাবাজি অার সন্ত্রাসি৷ তিনি পালন করেন বড় বড় গুরুদায়িত্ব, সম্মান কুড়াঁন ছাত্র রাজনীতিতে৷ বাম সংঘটন গুলোর নির্যাতন অার নিপীড়নও ভোগ করেন সাবেক এ ছাত্রনেতা। কিন্তুু নীতির উপর সবসময় অটল ছিলেন এ ছাত্রনেতা। সবাইকে নিয়েই সব কাজ করতে পছন্দ করতেন, এখনোও করেন।
ছাত্র রাজনীতি করলেও লেখাপড়ায় ভাটা পড়ে নি কখনো গোলজার অাহমদ হেলাল’র। গণিত বিষয়ের উপর ২য় শ্রেণি (2nd class) নিয়ে (বি.এসসি ও এম.এসসি-গণিত) সম্পন্ন করেন। জৈন্তাপুর’র তরুণ এ প্রতিভাবান মানুষ থেমে থাকেন নি লেখাপড়া নিয়ে। উচ্চতর গবেষণা অার অারো উচ্চ শিক্ষিত হওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন দেশের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত৷ অধ্যয়নে যোগদেন অাইন ও বিচার বিভাগের লেখাপড়ায়। শেষ করেন অাইন ও বিচার বিভাগের পড়াশোনা। উত্তীর্ণ হন কৃতিত্বের সহিত ১ম শ্রেণিতে। বর্তমানেও বি.এড ও এম. বিএ নিয়ে অধ্যয়নরত অাছেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে চলতি পড়াশোনা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সাবেক এ ছাত্রনেতা।
গোলজার অাহমদ হেলাল বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্কুল -কলেজে গেস্ট লেকচারার হিসেবেও অধ্যাপনা করেছেন। ছিলেন সিলেট জর্জকোর্টের এডভোকেটও,করেছেন উকালতি। দীর্ঘ নয় বছর বিভিন্ন মামলা নিয়ে কাজ করেছেন।কিন্তু নীতির উপর অটল থাকাতে চলে অাসেন কোর্টের বারান্দা থেকে। যোগদেন সাংবাদিকতা পেশায়। বর্তমানে গোলজার অাহমদ হেলাল গবেষণা, লেখালেখির পাশাপাশি সাংবাদিকতা নিয়ে কাজ করছেন বিভিন্ন পত্রিকায়। তাঁর নিজস্ব সম্পাদনায় দৈনিক অালোকিত সিলেট নামে পত্রিকা সময়ে সময়ে বের হয়।তিনি সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে সফলতার সহিত কাজ করে যাচ্ছেন। সিলেটের খবর ২৪.কম’র সম্পাদক হিসেবেও গোলজার অাহমদ হেলাল কাজ করছেন অত্যান্ত সুচারুরুপে।
সাংবাদিকতা, লেখালেখি অার গবেষণার পাশাপাশি জৈন্তাপুর ‘র এ গুণিজন বসে নেই অাঁখের গুছে।নিজেকে নিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অাছেন জৈন্তাপুর’র অাপামোর জনসাধারণের সাথে। সিলেট শহরে বসবাস করলেও নিজ জন্মমাটির কথা কখনোই ভূলে যান না। বর্তমান করোনাকালিন অার বন্যায় কবলিত এ জৈন্তাপুর’র জন্য কি না-ই বা করেছেন গোলজার অাহমদ হেলাল। কাঁধে চালের বস্তা অার নিত্য-প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে প্রতিদিনই ছুটে এসেছেন জৈন্তার অসহায় মানুষের দুয়ারে৷ খাল-বিল,নদী-নালা, ঝোঁপ-ঝাঁড় মাড়ি দিয়ে ছুটে যেতেন মানুষের দুয়ারে দুয়ারে। পৌঁছে দিতেন নিত্য ব্যবহার্য্য।
শুধু জৈন্তাপুর নয়– গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, সিলেট সদর সহ অনেক জায়গায় তাঁর দৌড়ঝাঁপ ছিলো চোখে পড়ার মতো৷ এতকিছুর পরেও গোলজার অাহমদ হেলাল নিজ পরিবারকে সঠিকভাবেই মূল্যায়ন করে যাচ্ছেন। প্রতিনিয়ত বৃদ্ধ মা, শশুড়-শাশুড়ী অার অাত্বীয়স্বজনদের সাথে মিশছেন ঘনিষ্ঠভাবে৷
১ ছেলে অার ১ মেয়ে সন্তানের জনক গোলজার অাহমদ হেলাল’র যেনো কোন কিছুতেই পিছুটান নেই। সকল কিছু দেখভালো করে এগিয়ে চলছেন জৈন্তাপুর’র ‘এ তরুণ মেধাবী ব্যাক্তি৷ কর্মঠ -উদ্দমী, সাহসী এ পুরুষ “জৈন্তাপুর উপজেলা পরিষদ” নির্বাচনে উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে প্রার্থী হতে ইচ্ছাপোষণ করছেন। অাগামী দিনে জৈন্তাপুর উপজেলাবাসী এ রকম একজন মানুষকে বেছে নিবে বলে অামার/অামাদের বিশ্বাস ।
মহামহিম যেনো এ গুণিজনকে ভালো রাখেন, সুস্থ রাখেন। অামি সেটাই প্রত্যাশা করি।
লেখক: ফজলে রাব্বী সাজু
আরএন( বিএনএমসি),বিএসএন(শাবিপ্রবি),এমপিএইচ(শেষপর্ব) এললউ।
ক্লিনিক্যাল ইন্সট্রাকটর-সিলেট উইমেন্স নার্সিং কলেজ, সিলেট।
