সাংবাদিকতার এক রাত

by News Room

সালাহউদ্দীন সুমন:

সাংবাদিকতা করতে গিয়ে এতো অসহায়ত্ব আর কখনো অনুভব করিনি। একটা ঘটনা কাভার করতে গিয়ে এতো দুশ্চিন্তা, এতো অনিশ্চয়তার মুখোমুখি আর কখনো হইনি। প্রতি মুহূর্তে মনে হয়েছে জীবনে প্রথম বারের মতো বড়ো কোনো ইভেন্টে শতভাগ ব্যর্থ হতে যাচ্ছি। চোখে ভাসছিলো হতাশাক্লেষ্ট এক নিউজরুমের কল্পিত দৃশ্য, আর এই দৃশ্যের অবতারক মনে হচ্ছিলো নিজেকেই।

 

গত ৩ জানুয়ারি বেগম খালেদা জিয়াকে গুলশানে তার রাজনৈতিক কার্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারা কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলার পরের দিনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েই সঞ্চয় করি অতিঅপ্রত্যাশিত নতুন অভিজ্ঞতা।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এই দিনটিকে গণতন্ত্র মুক্তি দিবস আর নির্বাচনের বাইরে থাকা জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি দিনটিকে গণতন্ত্র হত্যা দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়। ওই দিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলের সমাবেশ করার কথা ছিলো। তবে সমাবেশের অনুমতি মিলছিলো না কিছুতেই। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের শুরু থেকেই তথ্য পাওয়া যাচ্ছিলো যে, সমাবেশ করতে দেয়া না হলে নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান নেবেন বেগম খালেদা জিয়া। ৩ জানুয়ারি রাতে দলের যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অসুস্থ্য হয়ে পড়লে তাঁকে দেখতে আসার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন। ঠিক তখনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুলশান কার্যালয় ঘিরে তৈরি করে প্রতিবন্ধকতা। বন্ধ করে দেয়া হয় কার্যালয়ের প্রবেশ পথ, রাতেই নয়াপল্টন কার্যালয় থেকে আটক করা হয় রুহুল কবির রিজভীকে।
সঙ্গত কারণেই মুহূর্তের মধ্যে গণমাধ্যমগুলোর দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় গুলশানে। অন্যান্য গণমাধ্যমের পাশাপাশি ওই রাতে নাইট রিপোর্টার হিসেবে ঘটনাটি কাভার করেন সময় টেলিভিশনের রিপোর্টার তাফসির বাবু। সকাল থেকে পেশাগত দায়িত্বপালন করেন মানোয়ার হোসেন এবং ওমর ফারুক ভাই। দিনভর তারা তুলে ধরেন বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ের সার্বিক অবস্থার বিবরণ। ওই সকাল থেকেই কার্যালয়ের প্রবেশে ব্যাপারে জারি করা হয় অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা। সন্ধ্যার আগমুর্হর্তে সাংবাদিকদের জন্য কার্যালয়ের পকেট গেট খুলে দেয়া হয়। বেগম জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ কিংবা যোগাযোগের সুযোগ না থাকলেও সংবাদকর্মীদের অনেকেই কার্যালয়ে সভাকক্ষে অবস্থান নেন।
ওইদিন বিকেল থেকে আমার ডিউটি ছিলো গুলশানে। দু’জন ক্যামেরাপারসন ও দুটি ব্যাকপ্যাক (সরাসরি সম্প্রচারের সহজে বহনযোগ্য যন্ত্রবিশেষ) নিয়ে হাজির হলাম সেখানে। কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা হলো ওমর ভাইয়ের সাথে। তিনি আমাকে কার্যালয়ের ভেতরে একটি ক্যামেরা ইউনিট রেখে দিতে বললেন। আমি তাই করলাম। চিত্রসাংবাদিক মামুনকে একটি কর্ডলেস বুম (মাইক্রোফোন), ব্যাকপ্যাক দিয়ে ভেতরে রেখে অপর চিত্রসাংবাদিক মিজানুর রহমান মিন্টু ভাইকে নিয়ে কার্যালয়ের বাইরে এলাম। তখন পর্যন্ত কার্যালয়ে প্রবেশে কিংবা বের হতে কোনো বাধা দেয়া হচ্ছে না। আমি ৬টার বুলেটিনে লাইভের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। নিউজরুম থেকে এবং পিসিআর থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে। ৬টা বাজার ১০ মিনিট আগে হঠাৎ করেই বেগম জিয়ার কার্যালয়ের রাস্তার শেষ মাথার দিকে (গুলশান-২ নম্বরের দিকে) দৌড়াতে থাকে কিছু পুলিশ। কেউ কেউ বললেন, সেখানে বিএনপি’র কর্মী-সমর্থকরা সমবেত হচ্ছে।
কিছুক্ষণের মধ্যে লাইভে যেতে হবে, এই অবস্থায় যদি পুলিশের সাথে দৌড় দিই তাহলে লাইভ বাতিল করতে হবে। হঠাৎ মনে হলো, লাইভ বাতিল না করে কার্যালয়ের ভেতরের ইউনিট কিছুক্ষণের জন্য বাইরে নিয়ে এসে কাজটা করাই। চিত্রসাংবাদিক মামুনকে ডেকে সেখানে পাঠালাম। এই ফাঁকে ৬টার বুলেটিনে আমি সরাসরি সম্প্রচারে অংশ নিলাম। ৬টা ৫ মিনিটের দিকে মামুন ফিরে এসে জানালেন তেমন কিছু হয়নি, পুলিশ এমনিতেই শো-ডাউন করেছে। এরপর কার্যালয়ে প্রবেশ করতে গেলে মামুনকে বাধা দেয় পুলিশ। আমি সেখানে গেলে পুলিশ জানায়, পরবর্তী নির্দেশণা না আসা পর্যন্ত কার্যালয়ে কেউ আর প্রবেশ করতে পারবে না।
আসলে কার্যালয়ের ভেতর থেকে সাংবাদিকদের বাইরে বের করার পুলিশি কৌশলটি তাৎক্ষণিকভাবে ধরতে পারিনি। কার্যালয়ের গেট যে আবারো বন্ধ করে দেয়া হবে, এমনটা আমি ভাবিনি। এই ভুলের খেসারত দিতে হয়েছে রাতভর, সহ্য করতে হয়েছে মানসিক যন্ত্রণা।
যাহোক, এরপর আমি খোঁজ নিয়ে জানলাম, ভেতরে অবস্থান করছে একটি নিউজ চ্যানেলসহ প্রায় ৫টি টেলিভিশনের সংবাদকর্মীরা। এটা জানার পর আমার টেনশন বেড়ে গেলো কয়েকগুন। কারণ ভেতরে অবস্থান করছেন বেগম খালেদা জিয়া। সেখানে কোনো কিছু ঘটলে নির্ঘাত আমাকে মিস করতে হবে।
একই ফাঁদে পা দিয়ে দিশেহারা ইন্ডিপেনডেন্টের জাহানারা পারভিন আপা ও যমুনা টেলিভিশনের সাইফুদ্দিন রবিন। ভেতরে অবস্থান নেয়া চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের মহসীনুর রহমান বাদল ভাইয়ের সাথে মোবাইল ফোনে কথা বললাম। তিনি দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করে বললেন, যদি কিছু ঘটে, তার ফুটেজ দেয়া হবে। ফুটেজ পাবো তা তো আমিও জানি। কিন্তু অন্য চ্যানেল যখন সরাসরি সম্প্রচারে যাবে, তখন আমার কী দশা হবে!
যোগাযোগ শুরু করলাম বিএনপি’র প্রেস উইং-এর কর্মকর্তা শাইরুল কবির খান ও শামসুদ্দিন দিদার ভাইয়ের সাথে। তারা জানালেন, রাতে কোনো কিছু হবে না। যা হবার তা হবে পরের দিন সকালে (৫ জানুয়ারি)। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশ স্থলে যাওয়ার জন্য বের হওয়ার চেষ্টা করবেন বেগম জিয়া। তার মানে বেগম জিয়ার বের হওয়ার চেষ্টা করলে সেখানে একটি ঘটনার অবতারণা হবে। নিশ্চয় এই ঘটনা ঘটবে কার্যালয়ের ভেতরের অংশে। কারণ গেট খুলে বের হওয়ার কোনো পরিস্থিতি তখন চোখে পড়েনি।
তার মানে কোনোভাবে লাইভের সরঞ্জামসহ ভেতরে ক্যামেরাপারসনকে পাঠাতে না পারলে ইভেন্টটি মিস করবো আমরা।
কিভাবে কার্যালয়ের ভেতরে যাবো সেই চিন্তা করতে লাগলাম। নিজে না ঢুকতে পারলেও নিদেনপক্ষে ক্যামেরাপারসনকে পাঠাতেই হবে। ৭ টার বুলেটিনে সরাসরি সংযোগ শেষে কার্যালয়ের গেটের সামনে দেখলাম যমুনা টেলিভিশনের সংবাদকর্মী বন্ধু সাইফুদ্দিন রবিন দাঁড়িয়ে আছে। রবিনকে জিজ্ঞেস করলাম, ভেতরে তাদের কোনো ক্যামেরা ইউনিট আছে কিনা? সে বললো, না ভেতরে কেউ নেই। কোনোকিছু চিন্তা না করেই বললো, ভেতরে ক্যামেরা দিয়ে কী হবে?
আমি যখন বললাম, কয়েকটি টিভি চ্যানেলের ক্যামেরা ভেতরে রয়েছে। পাশাপাশি পরদিন সকালের সম্ভাব্য ঘটনা কাভারের বাস্তবতা যখন জানালাম, সঙ্গে সঙ্গে ওর চোখেমুখে চিন্তার রেখা ফুটে উঠলো। এবার দু’জনে মিলে শুরু করলাম তৎপরতা। পাশাপাশি প্রতি ঘণ্টায় বুলেটিনের শুরুতে ২/৩ মিনিট করে লাইভ করতে থাকলাম। প্রতি ঘণ্টায় এই দুইতিন মিনিট বাদে পুরো সময় কাটতে থাকে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। শায়রুল কবির খান ও শামসুদ্দিন দিদার ভাইয়ের সাথে দফায় দফায় কথা বলতে থাকলাম।
দু’জনই নিশ্চিত করলেন, যেকোনো উপায়ে আমাদের দু’জনকে ভেতরে ঢুকিয়ে নেবেন। তবে রাত গভীর হলে বিষয়টি সহজ হবে বলে জানালেন শায়রুল ভাই।ইতোমধ্যে হন্যে হয়ে ঘুরতে দেখলাম ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের সংবাদকর্মী জাহানারা পারভীন আপাকে। পারভীন আপাও বিকেলে কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু তিনিও কী একটা কাজে বাইরে গিয়েছিলেন কিছুক্ষণের জন্য। তাইতো কথায় কথায় শুধু আফসোস করছিলেন তিনি। নিজের ওপর বিরক্তি প্রকাশ করছিলেন বার বার। এবার আমি, রবিন ও পারভীন আপা মিলে পরিকল্পনা করতে থাকলাম।
এই ফাঁকে বিষয়টি জানিয়ে রাখলাম হেড অব নিউজ তুষার আব্দুল্লাহ ভাইকে। তুষার ভাই রিপোর্টারদের সমস্যার বিষয়টি খুব ভালো বোঝেন। মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিন নিষ্ঠার সাথে কাজ করেছেন বলেই এই সমস্যাগুলো তিনি সহজেই অনুধাবন করেন এবং রিপোর্টারদের নির্দেশনা, পরামর্শ ও সহযোগিতা করেন সব সময়। বিষয়টি জানার পর তিনি দুঃচিন্তা না করে ভেতরে প্রবেশের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন।
যেহেতু আমার ডিউটি ওইদিন দুপুর থেকে ছিলো, সেহেতু আমার ডিউটি শেষ হওয়ার কথা ছিলো রাত ১১টায়। কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনায় তুষার ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি সারারাত থাকতে পারবো কিনা? আমি আগে থেকেই সারারাত অবস্থানের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম। এই ইভেন্ট ছেড়ে যাওয়ার কোনো কারণ দেখিনি আমি। সে কারণেই তুষার ভাইকে বললাম, আমি থাকবো। অ্যাসাইনমেন্ট ডেস্ক থেকে এহসান জুয়েল ভাইও রাতে থেকে যাওয়ার ব্যাপারে কথা বললেন। আরও কথা হলো নিউজ এডিটরদের সঙ্গে। ধীরে ধীরে সময় গড়াতে থাকলো। বাড়তে থাকলো টেনশন। কার্যালয়ের মূল ফটক, চারিদিকের ওয়ালসহ সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম। সবখানেই গিজগিজ করছে পুলিশ। কোনদিক দিয়ে দেয়াল টপকানো অপেক্ষাকৃত সহজ হতে পারে সে বিষয়গুলোও মাথায় রাখলাম। বেগম জিয়ার কার্যালয়ের উত্তর পাশে আরেকটি গেট রয়েছে। ওই গেট দিয়ে প্রবেশের বিষয়টিও মাথায় রাখলাম। শায়রুল ভাইকে ফোন করে ওই গেটটি খুলে রাখতে বললাম। উনি বললেন, বিষয়টি সহজ হবে না। গেটের তালা খুলতে গেলেই টের পাবে পুলিশ। একেবারে গেট ঘেঁষেই বসে রয়েছে পুলিশ। আমি আর রবিন গিয়ে ওই পুলিশের সাথে কিছুক্ষণ গল্পগুজব করলাম। নানান কথায় তার মন গলানোর চেষ্টা করলাম। ওই পুলিশ সদস্য রাজিও হলেন। আমরা বললাম, ভেতর থেকে গেটের তালা খুলে দেয়া হবে, আপনি একটু ওদিকে হাঁটতে যাবেন, সুযোগ বুঝে আমরা ভেতরে প্রবেশ করবো। সবঠিকঠাক, কিন্তু বিধিবাম। ওই পুলিশের সাথে কথোপকথন খেয়াল করেছেন, পুলিশের উর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা। তিনি কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে সেখান থেকে সরিয়ে অন্যকে দায়িত্ব দিলেন।
এরইমাঝে বেগম জিয়ার কার্যালয়ের পাশের বাড়ি ডিঙিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করলাম আমরা। শামসুদ্দিন দিদার ভাই ওই বাসার গার্ডের সাথেও কথা বললেন। পরে আমরা ওই গার্ডকে ৫শ’ টাকা দিলাম। তিনি বললেন, মালিক ঘুমালে ডাকবেন আমাদের।
কপাল খারাপ হলে যা হয়, রাত বাড়ছে কিন্তু মালিক আর ঘুমায় না। উনি ব্যাকনিতে পায়চারি করেন, সিগারেট খান। ঘুমাতে যাওয়ার নাম নেই।
এমন জায়গায় বাড়ি থাকলে ঘুমাতে যাবেই বা কে। বাড়ির চারিদিকে শত শত পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন আর সাংবাদিকদের ভিড়। কারো সামান্যতম কৌতুল থাকলে ঘুমাতে যেতে পারবেন না, এটাই স্বাভাবিক। রাত সাড়ে ১০টার দিকে ওই গার্ড জানালেন, কোনোভাবেই কাউকে ওই বাসায় প্রবেশ করানো সম্ভব নয়। আবারো হতাশ হলাস। পারভীন আপাও গার্ডকে বুঝানোর চেষ্টা করলেন অনেকক্ষণ। লাভ হলো না।
রাত সাড়ে ১১টার দিকে শায়রুল ভাই ফোন দিলেন। ক্যামেরাপারসনকে নিয়ে পটেক গেটের পাশে দাঁড়াতে বললেন। আমি ক্যামেরাপারসন মিজানুর রহমান মিন্টুভাইকে প্রস্তুত হতে বললাম। শায়রুল ভাই পকেট গেট খুলে রেখে পুলিশের সাথে গল্প করতেই যমুনা টেলিভিশনের কামেরাপারসনসহ ৪/৫জন ভেতরে ঢুকে গেলো তড়িৎ গতিতে। মিন্টুভাই ঢুকতে যাওয়ার মুহূর্তের পুলিশ তৎপর। কার্যালয়ের ভেতরে কয়েকজন পুলিশ প্রবেশ করে উঠোন থেকেই ওই ৪/৫জনকে বের করে নিয়ে আসে। আর ৫ সেকেন্ড সময় পেলেই তারা কার্যালয়ের একেবারে ভেতরের কক্ষে চলে যেতে পারতেন। সেখান পর্যন্ত পুলিশের যাওয়ার নির্দেশণা ছিলো না, এখন পর্যন্তও নেই।
আবারো আপসেট হলাম। রবিন তার ক্যামেরাপারসনের ওপর একটু মনোক্ষুণ্ণ হলো। কেনো তিনি একেবারে ভেতরে যেতে পারলেন না, এই প্রশ্নটিই বার বার করলো সে।
রাত ১২টার পর আরেক দফা চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হলাম। ততোক্ষণে পুলিশ আমাদের ব্যাপারে সজাগ হয়েছে। আমরা যে যেকোনো মূল্যে ভেতরে প্রবেশের ব্যাপারে প্রতিজ্ঞ সেটা তারা আমাদের চলাফেরা এবং প্রচেষ্টায় পরিস্কার হয়ে গেছে। ওইদিন সেখানে পুলিশের একজন নারী সহকারী কমিশনার ছিলেন। সব সময় মুখ কালো করে থাকেন। রেগে রেগে কথা বলেন।
তার হাবভাব দেখে বুঝলাম, সুবিধা করা যাবে না। তারপরও ওই কর্মকর্তার সাথে আলাপ শুরু করলাম। আপা আপা করলাম অনেক্ষণ। ভেতরে প্রবেশের ব্যাপারে কথা বলতেই উনি ‘না’ করে দিলেন। ভেতরে কয়েকজন সংবাদকর্মী অবস্থান করছে, আমরা গেলে সমস্যা কোথায়? এমন প্রশ্নে উত্তরে তিনি বললেন, ‘আগে থেকে কে বা কারা ভেতরে প্রবেশ করেছে জানি না। এখন আমার সামনে দিয়ে কেউ প্রবেশ করতে পারবে না।‘

রাত ১টার দিকে কার্যালয়ের সামনে এলো বালুর ট্রাক। ১১টি ট্রাক রাখা হলো কার্যালয়ের মূল ফটকের দুই পাশে। ট্রাকের অবস্থানও সরাসরি সম্প্রচারে দর্শকদের দেখালাম। সার্বিক পরিস্থিতি বর্ণনা করলাম।
যা-ই বলি, যা-ই করি না কেনো মন তখনো- কিভাবে প্রবেশ করবো কার্যালয়ের ভেতরে- ওই চিন্তায় রত।

রাত ২টার দিকে শায়রুল ভাই ফোন দিয়ে বললেন, উত্তর পাশের ওয়ালের কোণায় আসতে। ওপাশ থেকে সেখানে একটি মইও লাগিয়ে দিলেন। তারমানে কোনোভাবে দেয়ালের ওপর উঠতে পারলে ভেতরে নামতে কোনো অসুবিধা হবে না।
কিন্তু সেখানে পুলিশ রয়েছে ১০/১২ জন। এরপরও ওই দেয়ালের আশপাশে ঘুরঘুর করতে থাকলাম। কয়েকজন পুলিশকে পটানোর চেষ্টা করলাম। ওরা রাজিও হলো। কিন্তু গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিক বিষয়টি আঁচ করতে পেরে সেখান থেকে ইউনিট বদল করলেন। কেউ যাতে দেয়াল টপকাতে না পারে তা খেয়াল রাখতে বললেন।

যখনই একটি করে প্রয়াস ব্যর্থ হচ্ছে তখনই পরের দিনের সম্ভাব্য মুহূর্তের বিষয়টি মাথায় আসছে। নির্ঘাত মিস হবে গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টটি। সারাদিন এতো পরিশ্রমের পরও চোখে ঘুমের লেশ নেই। মশা কামড়িয়ে গোটা শরীর ফুলিয়ে তুলছে, সেদিকে খেয়াল নেই।

এরই মাঝে শায়রুল কবির ভাই আবারো পকেট গেটের কাছে দাঁড়াতে বললেন। রাত তখন সাড়ে ৩টা। গেট খুলে বাইরে থেকে ইশারা করতেই ব্যাপপ্যাক কাঁধে, ক্যামেরা হাতে ভেতরে তড়িঘড়ি প্রবেশ করতে লাগলেন। পেছনে আমি। গেটে ঢুকতেই পেছন থেকে তিন চারজন পুলিশ আমাদের টেনে-হিঁচড়ে সরিয়ে নিয়ে এলো।

হতাশা নিয়ে গাড়ীতে বসে পড়লাম। ভাবতে লাগলাম সাত-পাঁচ। আফসোস হতে লাগলো খুব। কেনো সন্ধ্যায় ভেতরের ইউনিটটি বের করলাম। একটি অনিচ্ছাকৃত ভুলের মাশুল এতো বড়ো হবে বুঝিনি।

পারভীন আপা যখন হাল ছেড়ে দিয়েছেন তখন সেখানে আসেন সাংবাদিক পারভেজ খান ভাই। তিনি পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি জোগাড় করে ফেলেন। পারভীন আপা ঢুকতে যাবেন এমন মুহূর্তেই আটকে দেয় পুলিশ। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, পুলিশের অনুমতি মিললেও একটি গোয়েন্দা সংস্থা এ ব্যাপারে সম্মতি দেয়নি।
এরআগে বৈশাখি টেলিভিশনের কামরান করিম ভাই অনেক চেষ্টা করেছেন ঢুকতে পারেননি। তিনি এক সময় পুলিশকে বলেন, হয় আমাদের ঢুকতে দিন, নয় যারা (সংবাদকর্মীরা) ভেতরে আছেন, তাদের বের করে দিন। পুলিশ তাতেও সম্মত হয় না। পুলিশ বলে, ভেতরে যাওয়ার অনুমতি তাদেরও নেই।

কিছুক্ষণ পর আবারো ওই ওয়ালের পাশে গেলাম আমি, রবিন, পিয়াস আর আমাদের ক্যামেরাপারসন। পুলিশ সদস্য অনেকেই তখন ঝিমুনিতে আচ্ছন্ন। পরিকল্পনা হচ্ছে, আগে মিন্টু ভাই উঠবেন, তারপর পিয়াস ভাই, সবশেষে যমুনার ক্যামেরাম্যান। এরইমাঝে হঠাৎ করেই আমাদের আরেক ক্যামেরাপারসন মামুন লাফ দিয়ে ওয়ালে ওঠার চেষ্টা করলে তার হাত ফসকে যায়। আর সাথে সাথে দৌড়ে আসে পুলিশ। আবারো ব্যর্থ হলো পরিকল্পনা। মামুনের ওপর রেগে গেলেন পিয়াস ও রবিন। আমি বুঝিয়ে তাদের থামালাম।

ভোর ৪টার দিকে পুলিশের পুলিশের গুলশান জোনের ডিসি গাড়িতে উঠে ঘটনাস্থল থেকে চলে যাবেন এমন মুহূর্তে আমরা গিয়ে তার সাথে কথা বললাম। একাত্তর টিভির ক্যামেরাপারসন পিয়াস, রিপোর্টার আরেফিন শাকিল, রবিন ও আমি তাকে অনুরোধ করলাম। তিনি যখন কোনোকিছুতে রাজি হচ্ছে না, তখন আমি হঠাৎ করেই ক্ষুব্ধ আচরণ করলাম তার সাথে। আসলে মনমেজাজ ততক্ষণে রুক্ষ হয়ে গেছে।

আমি বললাম, আপনি কোনো এসেছেন এখানে? পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে তো? ঠিক আছে। আমিও আমার পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে এসেছি। আপনার কাজ ভেতরে কাউকে যেতে না দেয়া আর এখন আমার প্রধান কাজ হয়ে দাড়িয়েঁছে ভেতরে প্রবেশ করা। আমি আমার কাজ করবো, আমি প্রবেশ করবোই, আমি আপনার কাজ করুন।
তিনি বললেন, এই কাজটি করবেন না, প্লিজ।আমি বললাম, আমি ভেতরে যেতে না পারলে হয়তো আমার চাকরিই থাকবে না। আপনি এক কাজ করুন। আমি ভেতরে যাওয়া চেষ্টা করি, আর আপনি আপনার পুলিশ দিয়ে আমাকে বাধা দিন। পিটিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করুন। সকালে এই রক্তমাখা শরীর আমার প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের দেখিয়ে বলবো, এই দেখুন আমি চেষ্টা করেছি কিন্তু পারিনি। আমার প্রতিষ্ঠানও তখন বিষয়টি বিবেচনা করবে। এছাড়া আমার সামনে আর কোনো পথ নেই।

তিনি আমাকে শান্ত হতে বলে, গাড়ি হাঁকিয়ে চলে গেলেন। গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) ফিরোজ ভাইও শান্ত হতে বললেন।

ভোর রাতে সাইফুদ্দিন রবিন ও পারভীন আপা চলে গেলেন। আমি একাত্তরের পিয়াস ভাই চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকলাম। সকাল ৬টার দিকে পুলিশের ডিউটি বদল হলো। রাতের পুলিশ চলে গেলো এলো নুতন পুলিশ। তাদের অনেকেই রাতের ঘটনা বা নির্দেশণা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল না। ভাবলাম এই সুযোগ। মিন্টু ভাইকে যেকোনোভাবে এই সুযোগ কাজে লাগনোর তাগিদ দিয়ে লাইভে দাঁড়ানোর জন্য মামুন ভাইকে নিয়ে কার্যালয়ে সামনে গেলাম। লাইভ শেষ করে এসে দেখি মিন্টু ভাই দাড়িয়ে আছেন। তিনি বললেন, একাত্তরের পিয়াস ভাই লাফিয়ে পার হলেও ভারি ব্যাকপ্যাকের কারণে তিনি উঠতে পারেননি।কিছুক্ষণ পর আমাদের সকালের ইউনিট আসে। আসেন ওমর ফারুক ভাই ও মানোয়ার ভাই। সঙ্গে ক্যামেরাপারসন রিপন ভাই। রিপন ভাইকে দেখেই আমি একটু আশান্বিত হলাম। উনি দুর্দান্ত কাজ করেন, রিস্ক নেন যতোটা সম্ভব। আমি তাকে নিয়ে গিয়ে আবারো দাঁড়ালাম দেয়ালের ধারে। হাত দশেক দূরে পুলিশের দলের অবস্থান। আমি রিপন ভাইকে বললাম, আপনি সময় পাবেন ১০ সেকেন্ড। এরমধ্যেই কাজ সারতে হবে। ওপাশে মই আছে সেটা রিপন ভাইকে বললাম। উনি শুধু বললেন, ঠিক আছে। এরপর লাফ দিয়ে দেয়ালে ওঠার চেষ্টা করলেন। কিন্তু আবারো বিধিবাম। ওনার এক পা ফসকে ঝুলে গেলেন। আমি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলাম। নিচ থে ফসকে যাওয়া পা ধরে তুলে দেয়ার চেষ্টা করতে থাকলাম প্রাণপন। ততোক্ষণে হই হই করতে করতে দুই পুলিশ সদস্য আমার হাত ধরে ফেলে। আমি তাদের ঝাটকা দিয়ে ঠেলে ফেলে শক্ত করে রিপন ভাইয়ের পা ধরে উপরে ঠেলে দিই। রিপন ভাই এক ওয়ালে উঠে ক্যামেরা নেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পুলিশের তৎপরতার কারণে দ্রুত মই বেয়ে নিচে নেমে যান।
সাথে সাথে একরাশ শান্তির বাতাস বয়ে গেলো মনে। আনন্দে ভরে উঠলো রুক্ষ মন। নিশ্চিত হলাম, এবার আর ইভেন্টটি মিস করছি না।
কিন্তু মিনিট দুয়েকের মধ্যেই কয়েকজন পুলিশ এসে আমাকে বললো, ডিসি স্যার, আপনাকে ডেকেছেন। আপনি কেনো দেয়াল টপকাতে সাহায্য করলেন উনি জানতে চান।
আমি চিৎকার করে বললাম, কিসের পুলিশ কর্মকর্তা, আমি কাউকে চিনি না। সারারাত যখন তার কাছে অনুনয়-বিনয় করলাম, তখনই উনি কোথায় ছিলেন? এখানে একটি ঘটনা ঘটছে, ভেতরে সেই সংবাদ সংগ্রহ করা কি অন্যায়? তার সাথে কথা বলার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। যা-খুশি করুন। আমি আমার পেশাগত দায়িত্ব পালনের স্বার্থে যা করেছি, ঠিক করেছি।পুলিশ চলে যায়। এরপর মিনিট দশেকের মধ্যে ক্যামেরা, ব্যাকপ্যাক, কর্ডলেস বুম (মাইক্রোফোসন)সব কিছু পুলিশের অসর্তকতার সুযোগে পকেট গেটের উপরের ফাঁক দিয়ে রিপন ভাইকে দিই। এরপরই এসএমএস দিয়ে বিষয়টি জানিয়ে দিই তুষার ভাইকে।
সবকিছু দেয়ার পর মন-মেজাজ অন্যরকম ভালো লাগায় ভরে গেলো। দীর্ঘ ডিউটির পরও নিজেকে ক্লান্ত মনে হচ্ছিলো না। মনে হচ্ছিলো, ওমর ভাই ও মানোয়ার ভাইয়ের সাথে এখানে থেকে যাই। কী ঘটে তা দেখি।
পরে ভাবলাম, বিকেলে আবার এখানে আমার ডিউটি দেয়া আছে। একটু রেস্ট নিলে আবার অনেক রাত পর্যন্ত থাকতে পারবো। সেই ভেবে এক রাশ তৃপ্তি নিয়ে ফিরে আসি অফিসে। কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে উঠে দুপুরের পর টিভি ছাড়লাম বাসায়। দেখলাম, বেগম জিয়া বের হতে না পেরে গেটের পাশে থেকে কথা বলছেন। তা সরাসরি সম্প্রচার করছে আমাদের টেলিভিশন:সংবাদকর্মী:
সময় টেলিভিশন

You may also like

Leave a Comment