শুয়াইব হাসান :-
আমি একজন ক্রিকেটভক্ত, ‘সাকিবভক্ত’। বিশেষ করে বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রতি আমার আলাদা টান। নিজেও একসময় ক্রিকেট নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। ভোর থেকে সন্ধ্যা ছুটতাম মাঠ থেকে মাঠে। সেই প্রিয় খেলা থেকে আজ ৪-৫ বছর হলো অনেক দূরে। দূরত্ব যে পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়িয়েছে তা আমাকে পীড়া দেয়। কখনো খুব ইচ্ছা হয় আবার ছুটে যাই সেই দূরন্তপনায়।
ক্রিকেটের প্রতি আলাদা টান আর পেশাগত প্রয়োজনে গত বৃহস্পতিবার সিলেট বিভাগীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য আম্বার-বিজয় দিবস টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট ২০১৩ এর খেলা দেখতে গিয়েছিলাম। বিশ্বরেকর্ড গড়া দিনটিতে প্রিয় খেলোয়াড় সাকিব আল-হাসানকে নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে তাতে আমার নিজের জন্য দিনটি ‘খারাপ’ হিসেবে মনে হচ্ছে।
যে কোন দু:সংবাদে এমনিতে ঘাবড়ে যাই। আবার যখন প্রিয় খেলা এবং খেলোয়াড় বিষয়ক বিশেষ কিছু। বৃহস্পতিবারের এই সংবাদ আমার জন্য আরো যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছে। নিজের কোন প্রিয় মানুষ যখন অন্যায় কাজ করে বসে তখন সেটা কার কাছে কি রকম লাগে জানি না। তবে আমি যা বিশ্বাস করি তার বিপরীতে কিছু হলে মেজাজটা নষ্ট হয়ে যায়। অন্যদিকে, আমার জন্মভূমি, জন্মস্থান আর জন্মদাতাকে নিয়ে কেউ খারাপ আচরণ করলে বা কিছু বললে একটুও সহ্য করতে পারি না।
দিনের প্রথম ম্যাচ শেষ হবার পর কিছুটা রিলাক্স মুডে প্রেসবক্সে বসে আছি। সহকর্মী সাংবাদিকগণ এসে জানালেন- ‘সাকিব কান্ড’। প্রথমে বিশ্বাস করতে না চাইলেও ছবি যখন দেখলাম তখন অবিশ্বাস করি কিভাবে? অনেকে মানা করলেন নিউজ না করার জন্য। নিউজ করতে বসেও শেষ পর্যন্ত অর্ধেকে আটকা পড়লো।সবচেয়ে খারাপ লাগলো- সাকিবের প্রাইম ব্যাংক ক্রিকেট ক্লাবের কোচ বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ সুজনের বক্তব্যে। তিনি এই ঘটনার জন্য দু:খ প্রকাশ করে আবার হুমকি দিলেন- ‘সাকিবকে নিয়ে সংবাদ হলে সিলেটে আর কোন খেলা হতে দেবেন না।’
আশ্চর্য হলাম- সিলেটকে নিয়ে মানুষের ছোটমনা ভাব দেখে। সিলেটীরা সবসময়ই বিদ্বেষের শিকার। একসময় জাতীয় দলে সিলেটের হাতেগোনা কয়েকজন খেলোয়াড় থাকলেও এখন একেবারে শুন্যের কোটায়।
সুজন ভাই দুঃখ প্রকাশ করার পর আমি ব্যক্তিগতভাবে কখনো নিউজ করতে উদ্যত হতাম না। আমার বিশ্বাস- আমাদের সিলেটের কোন সংবাদকর্মীই এটা করতেন না। কিন্তু, যখন তিনি হুমকি দিয়ে দিলেন তখন আমাদের রক্ত টগবগে জ্বলে উঠলো। আসলে কী আমরা ঝিমিয়ে পড়বো? আমাদের আত্মসত্মা কী এত দুর্বল?
আমি খালেদ ভাইয়কে বলতে চাই- সিলেটবাসীকে আপনারা কি দিয়েছেন? আগামী বিশ্বকাপ টি-টোয়েন্টি’র বাছাই পর্ব আর মহিলাদের কয়েকটি খেলা? এটাই কি সিলেটের প্রাপ্তি ছিলো? আবার বলছেন, তাও ফিরিয়ে নেবেন! -যখন আইসিসি মাঠ পরিদর্শক দলের প্রধান ক্রিস টেটলি বলে গেছেন, সিলেট বিভাগীয় স্টেডিয়াম হবে বিশ্বের অন্যতম একটি ক্রিকেট মাঠ।
আমি বা আমরা কয়েকজন সংবাদকর্মী নিউজ না করলেও নিউজ আটকে থাকেনি। সিলেট ও জাতীয় পর্যায়ের অনেক সংবাদ মাধ্যমে সাকিবের এই ‘ভুল’ ফুটে উঠেছে।
আমার কাছে অনেকেই প্রশ্ন রেখেছিলেন- নিশ্চয়ই সাকিবকে কোন কটু কথা বলা হয়েছে, যার কারণে সে ওই দর্শকে কলার চেপে ধরতে বাধ্য হয়েছে। আবার কেউ বলেছেন, সাকিবের স্ত্রী শিশিরকে নিয়ে দর্শক নাকি খারাপ মন্তব্য করেছে।
যদিও ঘটনা এরকম নয়। ওই গ্যালারিতে ঘটনার সরাসরি প্রত্যক্ষদর্শী আমার এক ছোট ভাই জানিয়েছে, ‘স্কুল পড়ুয়া ওই ছেলেটি ছিলো সাকিব ভক্ত। টস শেষে যখন সাকিব ড্রেসিংরুমে ফিরে যাচ্ছিলেন তখন অনেকেই অটোগ্রাফ চাচ্ছিল। আর বৃটিশ বাংলাদেশ স্কুলে পড়া ‘কামালি’ নামের ওই ছেলেটি সাকিবের দিকে হাত বাড়িয়ে থ্যাঙ্কস দেয়ার চেষ্টা করে।হতে পারে ছেলেটি হাত সাকিবের গায়ে লেগেছিলো। কিন্তু সেতো সাকিবকে মারতে যায়নি। তার হাত বাড়ানো কি গালির পর্যায়ে চলে যায়। আর ছেলেটি এমন কিছু তো করেনি যে কারণে তার উপর চড়াও হতে হবে সাকিবকে। সংবাদ মাধ্যমে জানতে পারলাম, বিসিবি’র একটি সূত্র দাবী করেছে, সাকিব আল হাসানকে উদ্দেশ্য করে ঐ স্কুল ছাত্রের জনৈক আত্মীয় আপত্তিকর মন্তব্য করায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন সাকিব।
আচ্ছা, আমি জিজ্ঞেস করি- যে লোকটি সাকিবকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছে, ওই ছেলেটি তার আত্মীয় বলে সাকিব নিশ্চিত হলেন কিভাবে? আর আত্মীয় মন্তব্য করার অপরাধ কি ওই স্কুল ছাত্রের উপর বর্তায়?
আমি ভাবতে অবাক হই! একজন ক্রিকেটারের অনেক ভক্ত থাকে। মাঠের গ্যালারিতে উপস্থিত হয়ে তারা সাপোর্ট দেয়। চিৎকার করে সাকিব, মুশফিক, তামিম বলে। নিজের গায়ে কত কিছু লিখে প্রিয় খেলোয়াড়ের জন্য। ভাল খেললে রাস্তায় রাস্তার হয় মিছিল নিয়ে।
এমন অসংখ্য সাকিব প্রেমিক দেখেছি যারা ৩ বেলা খাবারের টাকা নাই, পড়ালেখা চালিয়ে যেতে কত না কষ্ট করছে। অথচ সাকিব-তামিমের খেলা সরাসরি দেখতে সব প্রতিবন্ধকতা উপক্ষো করে নিজের কস্টের জমা করা টাকা নিয়ে সিলেট বিভাগীয় স্টেডিয়ামে গিয়েছে, যেখানে ৫০ টাকার টিকিট কালোবাজারির কাছ থেকে কিনতে হয়েছে ২শ’ টাকা দিয়ে। আর সেই ভক্তের একটা ‘থ্যাঙ্কস ক্ল্যাপ’ আপনি সহ্য করতে পারবেন না!
দেশ-বিদেশের খেলাধুলায় কত স্লেজিংয়ের ইতিহাস শুনেছি। গ্রামের ছোট পরিসরে টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়ে কত কটু কথা কানে এসেছে। বিভিন্ন স্টেডিয়ামেও এরকম ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে যাচ্ছে। আর এতবড় মাপের একজন ক্রিকেটার হয়ে ‘সাকিব’ এমন আচরণ করবে এটা কেউই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। একজন জনপ্রিয় মানুষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হবেই, তাকে ক্ষেঁপিয়ে তোলার চেষ্টা চলবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এটা ভক্তদের কাজ নয়, প্রতিপক্ষের কাজ।’আর ওই গ্যালারির কোন দর্শক যদি এমনটাই করে থাকে তাও অস্বীকার করবো না। তাই বলে আমি গ্যালারির বিচিত্র দর্শকের সাথে সাকিবের তুলনা করবো? সাকিব বাংলাদেশের সাকিব আল-হাসান। বিশ্ব সেরা অল রাউন্ডার। বাংলাদেশের এক সময়ের অধিনায়ক। তিনি এখন শুধু শিশিরের অথবা বিশেষ কারো নন। শিশিরের বেলায় শিশিরে, নইলে পুরো বাংলাদেশের ১৬ কোটি ভক্ত অনুরাগির। একথা তার ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
সাকিবকে নিয়ে কিছু বলার মত যোগ্যতা হয়তো আমার নেই। তিনি এখন বাংলাদেশের অনন্য উচ্চতায়। তবে এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষা একই বছরে দিয়েছিলাম বিধায় বয়সে খুব একটা বড় হবেন না। আমি যা লিখেছি বাস্তবতার প্রেক্ষিতে লিখেছি। কোন সাকিবভক্তের কাছে খারাপ লাগলে আমি আন্তরিকভাবে দু:খিত। সাকিব তুমিও আমায় ক্ষমা করে দিও…।
‘সাকিব’ আমায় ক্ষমা করে দিও…
298
previous post
