স্বাধীনতা দিবস, স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র, মহামারী করোনাভাইরাস প্রতিরোধ ও উদ্ভুত সংকট মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি

গোলজার আহমদ হেলাল : আজ ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের ৪৯তম মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস।জাতীয় ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক ও স্মরণীয় (রেড লেটার ডে)দিন।বাঙালী জাতির মহান বিজয়গাঁথা গৌরবময় এক অধ্যায় ।আমাদের গৌরবের,অহংকারের এবং বাঙালী জাতির আত্মপরিচয়ের এ দিনে সুচিত হয়েছিল একটি স্বাধীন সার্বভৌম ও লাল সবুজের একটি পতাকা সম্বলিত স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মুক্তির আন্দোলন। মহান মুক্তিযুদ্ধ।
মহান এ দিবসের প্রাক্কালে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাংগালী, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কে ,যার অবিসংবাদিত নেতৃত্বে আমরা প্রিয় এই জন্মভুমিকে পাই তাঁর স্বাধীনসত্ত্বায় এবং প্রতিষ্ঠিত হয় আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার ।
গভীর শ্রদ্ধার সাথে আরো স্মরণ করছি এ জাতির আবেগ ও অনুভূতির ঠিকানা সকল শহীদ মুক্তিযোদ্ধা,বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাকে যাদের ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি প্রিয় মাতৃভুমি বাংলাদেশ।
জাতীয় এ দিবসে সর্বস্তরের দেশবাসী কে অকৃত্রিম ও অশেষ শুভেচ্ছা ।
অর্জিত হোক স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত মহান মুক্তিযুদ্ধের তিন মুলনীতি।এবং একযোগে কাজ করি (বাংলাদেশের জনগণের জন্য) সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায়। এই হোক আমাদের আজকের অঙ্গীকার।
স্বাধীনতা দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে দেশের সর্বত্র পালন করা হয়। প্রতি বছর এ দিনটিতে বাংলাদেশে উতসবের এক আবহ তৈরী হয়। এ দিনটিকে বাংলাদেশে জাতীয় দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয়। এবং সরকারীভাবে এ দিনটিতে ছুটি ঘোষণা করা হয়।বিগত দিনে এ উপলক্ষে প্রতি বছর বাংলাদেশে দিবসটি যথাযথ ভাবগাম্ভীর্য এবং বিপুল উতসাহ-উদ্দীপনার সাথে পালিত হত।
কিন্তু এবছর বৈশ্বিক মহামারী covid-19 ঠেকাতে,করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ঝুঁকি এড়াতে সকল ধরনের আনুষ্ঠানিকতা শিথিল করা হয়েছে।সভা সমাবেশ বাতিল করা হয়েছে।জাতি হিসাবে এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের।বংবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর বছরে সাধে এবং আহলাদে দিবসটি পালন করা গেল না।
আজ সারা দুনিয়া এক ভয়াবহ সংকট কাল অতিক্রম করছে।নিকট অতীতে এধরনের সংকট মোকাবেলা পৃথিবীবাসী করছে কি না আমার জানা নাই।বিজ্ঞানের জয়যাত্রা দিয়ে বিশ্ববিজয়ের এমন এক যুগ সন্ধিক্ষণে আমরা বিশ্ব বিপর্যয়ের কবলে পড়েছি।মহাদুর্যোগের করালগ্রাসে মানব সভ্যতা নিপতিত।
করোনাভাইরাস এর প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে আজ জাতি ও ভৌগলিক সীমানাভিত্তিক রাষ্ট্র গুলো যার যার মত প্রস্তুতি নিচ্ছে।উন্নত বিশ্বেের ধনী রাষ্ট্র গুলো যে ভাবে হিমশিম খাচ্ছে।সেখানে মরণের মিছিল চলছে।কিছুই করতে পারছে না তারা।
এ দিক দিয়ে আমাদের দেশে প্রস্তুতি নেই বললেই চলে।আমরা অনেক পিছিয়ে।আমরা এমনিতেই গরীব দেশ।তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দরিদ্র দেশ।এখানে শিক্ষার হার কম,অশিক্ষা -কুশিক্ষা বেশী।সিংহভাগ জনগণ দারিদ্রসীমার নিচে বাস করছে।সবাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা ভালো নয়,উন্নতও নয়।জনগণ আইন মানে না।আইনের শাসনও নেই।সুতরাং এখানে Prevention is better than cure.এই ফর্মুলাই বেশী প্রযোজ্য ছিল।
আমরা গভীরভাবে লক্ষ্য করলাম।চীন দেশে এই ভাইরাস উতপত্তি হওয়ার পর বিজ্ঞানী আর গবেষকরা বললেন এটি সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়বে।এর প্রতিষেধক নাই।তাই জনস্বাস্থ্য বিধি মেনে চললে ইহা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
আমরা ছিলাম তখন অচেতন। তিনমাস সময় পাওয়ার পরও আমরা, আমাদের নীতি নির্ধারকরা সচেতন হলাম না।প্রবাস ফেরত জনশক্তিদের বিমানবন্দর থেকেই কোন কার্যকর ব্যবস্থা নিলাম না।এখন চোর ধরার মত খুজছি।এর চেয়ে লজ্জা আর কি হতে পারে।আমরা ডাক্তার ও নার্সদের এখনো কোন প্রটেকশন দিতে পারে নি।হাসপাতালগুলো প্রস্তুত করতে পারি নি।শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জেগে উঠতে হয়।আন্দোলনর ডাক দিতে হয়।কিন্তু কেন?
আমাদের আস্থা আর সাহসের প্রতীক পুলিশ ভাইদের কি প্রটেকশন আছে?গণমাধ্যম কর্মীরা জীবনে ঝুঁকি তে তো আছেই?
সবচেয়ে বড় বিষয় হল চারিদিকে যখন দুর্যোগ ছড়িয়ে পড়ে সে সময় এবং এর পরবর্তী সময় সংকট আরো ঘনীভূত হয়।এবং ইহা ভাইরাসের চেয়েও ক্ষতিকর হয়। প্রচুর খাদ্যাভাব,অর্থনীতিক মন্দা ও আর্থিক সংকট জনজীবন কে বিষিয়ে তোলে।মহামারি তখন গৃহযুদ্ধ এবং দুর্ভিক্ষে পরিণত হতে পারে।
নিওলিবারেলিজমের যুগে সংকট কালে বাজার অস্থিতিশীল হয়।একদল লোভী, মুনাফাখোর, রক্তচোষা গোষ্ঠী তৈরী হয়।অসাধু ব্যবসায়ী সিণ্ডিকেট গড়ে উঠে।গত সপ্তাহে এরকম এক অশনিসংকেত আমরা বাজারে দেখলাম।আমাদের জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের শক্ত হেন্ডেলে মাত্র দু’দিনেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।আড়তদার আর মজুতদাররা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে নি।
রাজনীতি মানুষের কল্যাণে।আমাদের রাজনীতি বিদরা কোন দিকে?জাতির এই সংকট কালে তাদের করণীয় কি নেই?
আমরা আশ্বররয হলাম, করোনাভাইরাস এর উদ্ভবের তিন মাস সময়ে সরকার না হয় ১৭ মার্চের প্রস্তুতি নিচ্ছে।আপনারা কি করলেন?আপনাদের কি দায় নেই?সচেতনতা মুলক কিংবা সরকার কে পরামর্শমুলক একটি কথাও বলেন নি।
আমরা দেখেছি,একটি মাত্র মেয়ে বার বার কথা বলছে।প্রথম কথাটিই করোনা সংকট মোকাবেলায় তার মুখ থেকে উচ্চারিত হয়েছে।শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থেকে শুরু করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কে খাবারের প্রয়োজন মেটানো,সবাস্থ্য
সেবা,জনসচেতনতার জন্য social distancing ও জনস্বাস্থ্য বিধি প্রতিপালনে সরকারের করণীয় কি তার দাবীতে ফুটে উঠেছে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা স্বতন্ত্র জোট থেকে বিগত ডাকসু নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সংসদে ভিপি পদপ্রার্থী অরণি সেমন্তি খান ও তার স্বতন্ত্র জোটের কোভিড-১৯ মোকাবেলায় একের পর এক সচেতনতামুলক আহবান, বলা যায় নীরব মানবিক আন্দোলনের পাশাপাশি দেখতে পাই ডাকসু ভিপি সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদের নেতা নুরুল হক নুরের আহবান ও করনীয় সম্পর্কে মুল্যবান কথা বলা।
এরপর দেখলাম প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতির ধারক ও বাহক বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কিছু পদক্ষেপ।ইতোমধ্যে আমাদের জনগণের সরকার নড়েচড়ে বসল।উত্তর ও দক্ষিণ পন্থী কিছু রাজনৈতিক সংগঠন সচেতন হল।এনজিও ব্যাক্তিত্ব স্বপ্না ভৌমিক ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের জাফরুল্লা চৌ. এগিয়ে এলেন।এ কথামালা লেখা পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন মানবতার সেবায় কাজ করার খবর পাওয়া গেছে।
নভেল করোনাভাইরাস মোকাবেলায় তার সরকারের প্রস্তুতি ও করণীয় সম্পর্কে গতকাল সন্ধায় জাতির উদ্দেশ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দিয়েছেন।তিনি সকলের সহযোগিতা চেয়েছেন।আজ থেকে বেসামরিক জনপ্রশাসন কে সেনাবাহিনী সার্বিক সহায়তা করবেন।সবাস্থ্য বিভাগ সর্বোচ্চ সেবা দিবে।প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কে আর্থিক ও খাদ্য সংকট সমাধানে সরকারের সাহায্যদানের কথা বলেন।
সবমিলিয়ে বৈশ্বিক এ সংকট দাবী করছে নতুন এক সভ্যতা।চলমান শিল্পায়ন ভেংগে পড়বে,অর্থনীতিতে মারাত্মক আঘাত আনবে,রাষ্ট্র ব্যবস্থা অকেজো হয়ে যেতে পারে।ক্ষণ ভংগুর সমাজ ও অর্থনীতির উপর দাঁড়িয়ে নতুন এক পৃথিবী গড়বে মানুষ।
আমরা অত্যন্ত মর্মাহত ও ব্যাথিত, ৪৯তম স্বাধীনতা দিবসের প্রথম প্রহরে ন্যা্য্য দাবী ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য একজন কে প্রাণ দিতে হল।স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রে উল্লেখিত মহান মুক্তিযুদ্ধের তিন মুলনীতি সাম্য,মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার বিগত ৪৯ বছরেও প্রতিষ্ঠিত হয় নি।জনগণ এখনো বঞ্চিত।
চলমান করোনাভাইরাস মোকাবেলার এ যুদ্ধে বন্দুকের নলের মুখে কোন নাগরিকের আর যেন প্রাণহানি না ঘটে , রাষ্ট্র কে তা নিশ্চিত করতে হবে।
আসুন,মানবিক হই।মানবিকতার জয়গান গাই।
আর্তপীড়িতদের সেবা করি।দুঃখী ও দরিদ্রদের পাশে দাঁড়াই।
ধরণীর বুকে রোগ,ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলি।রাজনীতি নয়,কাজ করি মানবতার কল্যাণে।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক- দৈনিক আলোকিত সিলেট, সহ সভাপতি- সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*