একজন অরণী সেমন্তী খান:স্বতন্ত্র জোটের ভিপি পদপ্রার্থী, কেন্দ্রীয় সংসদ, ডাকসু নির্বাচন ২০১৯

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিভাগের ছাত্রী অরণি সেমন্তী খান। ডিনস অ্যাওয়ার্ডসহ পেয়েছেন নানা পুরস্কার। স্বতন্ত্র জোট থেকে ডাকসু নির্বাচনে ভিপি পদেও লড়েছেন। তাঁর সঙ্গে গল্প করে এসেছেন মীর হুযাইফা আল মামদূহ ।ছবি : লাইমলাইট মেমোরি
৮ এপ্রিল ২০১৮। কোটা সংস্কার আন্দোলনে এদিন পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। পুলিশ বেদম পেটায় তাঁদের। একই রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনেও ভাঙচুর চালানো হয়েছিল। কে বা কারা উপাচার্যের বাসভবনে হামলা চালিয়েছে তখনো তার হদিস না মিললেও একদিন পর দেখা গেল, বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক উপাচার্যের বাসভবনে হামলাকারীদের বিচার চেয়ে অপরাজেয় বাংলার সামনে মানববন্ধন করলেন। মেয়েটি তখনো কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হননি। বলছিলেন, ‘তখনো এই আন্দোলন নিয়ে ততটা জানতাম না, তাই যুক্ত হইনি। কিন্তু আগের রাতে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলা আর একদিন পর স্যারদের এই মানববন্ধন দেখে খুব খারাপ লেগেছিল। তাই ওই সময় তিনটা প্লাকার্ড বানাই, তাতে ক্যাম্পাসে পুলিশি হামলার ব্যাপারে শিক্ষকদের নীরবতাকে মনে করিয়ে দেওয়া বক্তব্য ছিল। প্লাকার্ডগুলো নিয়ে আমি আর আমার তিন বন্ধু সেদিন স্যারদের মানববন্ধনের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম।’
তাঁর এক শিক্ষক সেদিনের এই ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে লিখেছিলেন, ‘আমি আমার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত শিখছি।’

সেদিন ছোটখাটো গড়নের একটা মেয়ের আকাশসমান সাহস মুগ্ধ করেছিল ক্যাম্পাসের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের।

মেধাবী এই তরুণীর নাম অরণি সেমন্তী খান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এখন এক নামেই পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন প্রকৌশল ও জীব-প্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষার্থী।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের পর এলো নিরাপদ সড়ক আন্দোলন। সেখানেও অরণির মাথা ফেটে যাওয়ার ছবি ফেসবুকে বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। ১০টা সেলাই লেগেছিল তাঁর মাথায়। চুল কেটে ফেলতে হয়েছিল। তারপর এলো ডাকসু নির্বাচন। তখন ‘স্বতন্ত্র জোট’ গঠন করে সেই জোটের ব্যানারে ভিপি পদে দাঁড়িয়ে আবারও আলোচনায় এলেন এই তরুণী। নির্বাচনে প্রচারণার সময় ওই মেয়েটিই সবাইকে বলে বলে জড়ো করেছেন। সবার ভেতরে ডাকসুর জন্য উদ্দীপনা জুগিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন ২০১৩ সালে। ভূগোলে। কয়েক দিন ক্লাস করার পর আর ইচ্ছা করেনি। কারণ তাঁর পছন্দের বিষয় জিন প্রকৌশল। ভূগোলে তাই আনন্দ পাচ্ছিলেন না। সে বছর গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনেও অংশ নিয়েছিলেন। পাশাপাশি ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিও নিলেন বেশ। পরের বছর আবার ভর্তি পরীক্ষা দিলেন। ‘এ’ ইউনিটে ১৭৪তম হয়ে নিজের পছন্দের বিভাগে ভর্তি হলেন।

প্রথম বর্ষ বেশ ভালো কাটালেন। নিয়মিত ক্লাস, ঘুরে বেড়ানো, বন্ধু-আড্ডা—সব করেও পড়াশোনায় ফাঁকি দেননি। ফলাফল বছর শেষে সিজিপিএ চারের মধ্যে ৩.৮৫। দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় ক্যাম্পাসে মেট্রো রেলের রুট বদলের আন্দোলনে অংশ নিলেন। তবে এবার সিজিপিএ একটু কম ছিল। তৃতীয় বর্ষে এসে নানা কারণে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। ক্লাস শেষ করেই বাসায় চলে যেতেন। অনার্সের চূড়ান্ত ফলে দেখা গেল সিজিপিএ চারের মধ্যে ৩.৭৫ পেয়েছেন তিনি। ক্লাসের উপস্থিতি ৯৫ শতাংশ। বিভাগে তৃতীয় হলেন। ভালো ফলাফলের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন ডিনস অ্যাওয়ার্ডও। অরণি বললেন, ‘আমি ক্লাসে নোট নিতাম না। কোনো কোনো ক্লাসে বসে বই পড়তাম। আমার বন্ধু সোতি রাহিল নাসের হুবহু নোট করত। সেটা নিয়ে নিজের মতো করে নোট বানাতাম পরীক্ষার আগে। তাতেই হয়ে যেত।’ তিনি আরো যোগ করেন, ‘ক্লাসের পড়ার বাইরেও অন্য বই পড়তে হবে খুব। তাহলে ক্লাসের পড়াটাই খাতায় বুঝিয়ে লেখার মতো যোগ্যতা হয়ে যাবে।’
ডাকসুর নির্বাচনে দাঁড়ানোর প্রসঙ্গে বললেন, ‘নির্বাচনের আগে ক্যাম্পাসের অবস্থা দেখে আমরা বেশ আশাহত হচ্ছিলাম। কিছু জুনিয়র মিলে তাই ‘চায়ের কাপে ডাকসু’ নামে একটা আড্ডার আয়োজন শুরু করেছিল তখন। একটা সময়ে তাঁরা আমাকেই নির্বাচনে দাঁড়িয়ে যেতে বললেন। আমরা আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি করতে এসেছি। আমাদের মাথায় কোনো দলীয় লেজুড়বৃত্তির চাপ নেই। অতীতেও শিক্ষার্থীদের হয়ে কথা বলেছি। সামনেও বলব।’ জিজ্ঞেস করেছিলাম, চাইলেই একটা সুন্দর একাডেমিক জীবন পেতে পারতেন, তা না করে রাজনীতিতে কেন? বললেন, ‘আমার মা-বাবা বাম রাজনীতি করতেন। মায়ের নানা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নানিরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। আমি এসব গল্প শুনেই বড় হয়েছি। তাই রাজনীতি আমার রক্তেই আছে।’

ভালো ফল আর আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই অরণির জীবন। অনেক অর্জন আছে তাঁর। অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ছাত্রী ছিলেন। সেখানেও বেশ নাম করেছেন। ভালো ফলাফলের জন্য পেয়েছিলেন ডেইলি স্টার অ্যাওয়ার্ড।
স্পেনিশ ভাষা, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কোর্স করতে একবার স্পেনেও গিয়েছিলেন। মাসখানেক ছিলেন সেখানে। ২০১৭ সালে নিজের বিভাগ আয়োজিত ‘ডিএনএ ডে’-তে আইডিয়া কম্পিটিশনে হয়েছেন চ্যাম্পিয়ন। ছায়ানটে লোকসংগীতে এক বছরের সূচনা কোর্স করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞান সমিতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ভ্রমণ বেশ পছন্দের অরণির। সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়েন। পাহাড় টানে তাঁকে। বান্দরবানে তাই যাওয়া হয়েছে অনেকবার। সময় পেলেই বই পড়েন। লেখালেখিও করেন। সেলিনা হোসেন, জহির রায়হান আর অরুন্ধতি রায় তাঁর পছন্দের লেখক।

কিছুদিন আগে অরণির মাস্টার্সের লিখিত পরীক্ষা শেষ হয়েছে। এখনো ফল প্রকাশিত হয়নি। আপাতত থিসিস করছেন ডায়াবেটিসের ওষুধ নিয়ে। থিসিস শেষে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে দেশের বাইরে যেতে চান তিনি।

সুত্র: অরণি এক উদাহরণ-কালের কন্ঠ (১ মে ২০১৯ইং)

Image may contain: 1 person, smiling

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*