হৃদয়ে আগুন জ্বলে


গোলজার আহমদ হেলাল:রাত বেজে ১২টা ২১ মিনিট। অফিস থেকে বের হলাম বাসায় ফিরতে। আমার ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলটা স্টার্ট দিতেই পাশে এসে দাঁড়ালো দু’সন্তানের জননী হতভাগিনী আমিনা ও তার দু’শিশু। আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল “স্যার, সকাল থেকে আমার বাচ্চাগুলোকে কিছু খাওয়াতে পারিনি। অন্তরে আগুন জ্বলতেছে। বড় কষ্টে আছি। বিশটা টাকা দেন।”
বাসায় চলে গেলাম ঘড়িতে বেজে ১.১৫ মিনিট। হাত মুখ ধুঁয়ে খেতে বসেছি। কিন্তু খেতে ভাল লাগছে না। ভাবলাম, স্বাধীনতার মাস। বাংলাদেশের সাহসী জনগন এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাকিস্তানী অত্যাচারী শাসকদের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করেছিল এ মাসেই। শুধু তাই নয়, নতুন করে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান পেল স্বাধীন একটি দেশ, নাম তার বাংলাদেশ। কিন্তু, স্বাধীনতার ৪১টি বসন্ত অতিক্রান্ত হল এখনও আমিনার মতো হাজার হাজার জননীর হৃদয়ে আগুন জ্বলা বন্ধ হচ্ছেনা। কেন? আমরা এখনও কি স্বাধীনতার সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছতে পারছি না?
মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা যুদ্ধ কিংবা স্বাধীনতার মাস-এর কথা ভাবতেই সাত মার্চের কথা বলতেই হয়। কারন ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষন আর স্বাধীনতা যুদ্ধ ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। ১৯৭১ সালের ঐ দিনেই বাঙ্গালী জাতির অবিসংবাদিত এ নেতা রেসকোর্স ময়দানে বিশাল সমাবেশে যে ভাষন দিয়েছিলেন তা উপস্থিত জনগনকে উদ্দিপ্ত করেছিল। তাঁর বক্তব্যে দীর্ঘ ২৩ বছর পাকিস্তানী শাসকরা যে বৈষম্য, অনিয়ম, নির্যাতন, নিপীড়ন, অবিচার চালিয়েছিল বাঙাগালীর উপর তা তুলে ধরেছিলেন এক আবেগময়ী বিপ্লবী কথার মধ্য দিয়ে। জাতি সেখানে পেয়েছিল আশার আলো, জনগন পেয়েছিল শোষন, বঞ্চনা থেকে মুক্তির সঠিক পথনির্দেশনা। নিরপরাধ অসহায় মানুষ পেয়েছিল ভবিষ্যত করণীয়। শুরু হয়েছিল শোষক শাসকদের বিরুদ্ধে এক মহান বিপ্লব। মহান মুক্তিযুদ্ধ। এ কথা সর্বজনবিদিত সত্য যে, বঙ্গবন্ধুর ভাষনই পাকিস্তানিদের ভিত্তি নরম করে দেয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এখন চলছে নানা বিতর্ক। যা স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে সত্যিই অপমানজনক। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ বিপক্ষের শক্তির ধোঁয়া তুলে আজ নতুন তরুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। যেকোন সময় যেকোন জনপদের লোকজনকে সভ্যতার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। আর এক্ষেত্রে সহযোগীতা করে ইতিহাস। তবে ইতিহাসটা হতে হবে সত্য ঘটনা দ্বারা ভরপুর। একটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন- বিজয়ীরা সবসময়ই ইতিহাস রচনা করে থাকে, বই এর পাতায় ইচ্ছেমতো তাদের কাহিনী তুলে ধরে। তাই বিজয়ের উল্লাসিত আনন্দে অতিরঞ্জিত কোন কিছু হয়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। কিছু দিন আগে পত্রিকার পাতায় দেখা যায় মাননীয় বিচারপতির মন্তব্য ইতিহাস বিকৃতির অজুহাতে কাউকে জাহাজে করে বা প্লেনে পাকিস্তানে পাঠানোর নির্দেশ। দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে কিংবা ইতিহাস বিকৃত করলে পাকিস্তান কেন, দ্বীপান্তর ও করা যায় অথবা আইনে বর্ণীত যে কোন শাস্তি প্রদান করা উচিত। তবে এর পূর্বে আমাদের প্রাজ্ঞ, অভিজ্ঞ, জ্ঞানী-গুনীজনদের প্রতি অনুরোধ সত্য ইতিহাসটা রচনা করুন, জাতির সামনে তুলে ধরুন। সকল জনগনকে প্রয়োজনে অবহিত করুন।
চলে গেলাম ভিন্ন প্রসঙ্গে। সাড়ে ৭ কোটির দেশ এখন ১৬ কোটি জনগনে ভরপুর। মানুষের মৌলিক চাহিদা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা রাষ্ট্র কি সবাইকে দিতে পেরেছে? অসহায় দুর্বলদের ক্ষুধার জ্বালা কি নিবারণ আমরা করতে পেরেছি? বেকারদের কর্মসংস্থান হয়েছে কি? জান, মাল, ইজ্জতের নিরাপত্তা আছে কি? এগুলোর কোনো জবাব নেই। ব্যর্থ এই দেশ। তাইতো ৪১ বছর পরে শুনতে হচ্ছে ‘ভিক্ষা দাও, ভিক্ষা দাও/ফিরে চাও ওগো পুরবাসী/ সন্তান দ্বারে উপবাসী/দাও মানবতা ভিক্ষা দাও।’
আমাদের মানবতা- মনুষত্ব লোপ পেয়েছে, না তৈরী হয়নি সে বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে চাইনা। কিন্তু, বাঙ্গালী এবং মানুষ এ দু’টো শব্দের ব্যবধান কতটুকু বুঝতে পারিনি এখনও। মানুষ তার চারপাশে তাকালে সমাজের অসংখ্য বেদনাময় চিত্র দেখতে পায়। কেউ জীবন দিয়ে পরিশ্রম করেও দু’বেলা খেতে পারে না, কেউ নিঃস্ব গৃহহীণ, কেউ ভুমিহীন, কেউ বেকার, সহায় সম্বলহীন। অন্যদিকে সমাজের কিছু সংখ্যক মানুষের রয়েছে অঢেল সম্পদ। আমোদ-প্রমোদ, বিয়ে অনুষ্ঠানেহাজার হাজার অতিথির আপ্যায়ন, বিশেষ পার্টির নামে শত শত লোকের জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান এবং ইদানিংকালে বিলাসী ভাবে ঘটা করে ১লা বৈশাখ, ৩১ শে ডিসেম্বর, এপ্রিল ফুল, আরো কত কি পালন হয়। ব্যয় হয় কত টাকা পয়সা। নষ্ট হয় কত খাদ্য। অথচ আমাদের পাশেই অনাহারে ক্লিষ্ট মানবতা উচ্ছিষ্টগুলোও পাচ্ছেনা। এ কোন মানবতা। রবীন্দ্রনাথ সত্যিই বলেছিলেন ‘সাড়ে সাতকোটি বাঙ্গালীর হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙ্গাল করে মানুষ করনি।’ সত্যিকার মানুষ, মানবতা তৈরী করতে পারলে ক্ষুধা, দরিদ্রতা লোপ পাবে। গড়ে উঠবে সুন্দর দেশ। বন্ধ হবে অসহায় জনগনের হৃদয়ের আগুন। পাশাপাশি জাতিকে সেই ইংরেজী প্রবাদটি স্মরণ করে দিতে চাই যার বাংলা হলো ‘অর্থ আয় করা সহজ, কিন্তু ব্যয় করা কঠিন।’ আমরা এমন কিছু ব্যয় করি যা না করলেও চলে। মনে রাখতে হবে একটি ছোট ছিদ্র মস্তবড় জাহাজকে ডুবিয়ে দিতে পারে। তাই ফ্রাঙ্কলিনের ভাষায় ছোট ছোট ব্যয় সম্বন্ধে সাবধান হতে পারলে এ সমাজ অসহায় ও দারিদ্রের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে। আর তখনই প্রকৃত স্বাধীনতার সুখ জাতি নিরানন্দে ভোগ করতে পারবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

লেখকঃ সাংবাদিক,সমাজকর্মী ও সংগঠক ।
তারিখ:১২/০৩/২০১২ইংরেজী।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*