স্বপ্ন দেখছে মেঘলা

by News Room
জয়ন্ত সাহা:‘উত্তরের সুর’ সিনেমার প্রধান চরিত্র ‘আয়েশা’র ভূমিকায় অভিনয়ের করে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০১২’ শিশুশিল্পী শাখায় বিশেষ পুরস্কার পেয়েছে ইসরাত জাহান মেঘলা। নানা বাধাবিপত্তি পেরিয়ে মেঘলা এখন বড় অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন বুনছে। এ লক্ষ্যে প্রস্তুতিও চলছে পুরোদমে।

মোহাম্মদপুরের শেখেরটেক বালুর মাঠ এলাকার বস্তির স্যাঁতসেঁতে ঘরটিতে সূর্যের আলো পৌঁছায় না ঠিকমতো। জীবনের নানা টানাপড়েনে হতাশার কালো মেঘে আচ্ছন্ন ছিল এ ঘর। এ ঘর এখন ‘মেঘলা’ আলোয় আলোকিত। যে মেঘলাকে এতদিন কেউ চিনত না, সে মেঘলা এখন রীতিমতো তারকা।

মেঘলাদের বাসায় ঢোকার পথে উৎসুক পড়শিদের ভিড়। সিনেমা, অভিনয়সহ আরও নানা বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাচ্ছে মেঘলা। এক গাল হেসে মেঘলা বলে, “এরা আমার বিরাট ভক্ত। আমাকে অনেক উৎসাহ দেয়।”

‘মেঘলা’র গল্প শুরু করেন মা লাইজু বেগম। তিনি জানান, মেঘলার শুরুটা বাবা মুজিবুর রহমানের হাত ধরে। পেশায় সিএনজি চালক বাবা নিয়মিত ঢুঁ মারতেন গানের আসরে। ঘরে ফেরার গলিপথে চায়ের দোকানে বসে টিভিতে দেখতেন, ছোট্ট শিশুরা কী সুন্দর গাইছে, অভিনয় করছে। এ দেখে তারও শখ জাগল, মেয়েকে নাচ-গান-অভিনয় শেখার কোনো একটা স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেবেন। স্ত্রী লাইজু বেগমকে এসব বলতে হেসেই খুন হন।

মেঘলা কিন্তু বসে ছিল না। শিশুটি তখন টিভি দেখে দেখে নাচ তুলছে, গান গাইছে।  দুদিন যেতেই আসরও জমিয়ে দিল সে। ছোট্ট মেয়েটির নাচ দেখতে রীতিমতো ভিড় লাগত পাড়ায়।

এবার গল্প এগিয়ে নেয় মেঘলা। মায়ের গল্পের সূত্র ধরে মেঘলা বলে, “তখন আমি খুব ভালো গান করি, নাচ করি। তাই দেখে বাবা একদিন আমাকে মোহাম্মদপুরের টোকাই নাট্যদলে ভর্তি করিয়ে দিল। প্রথমে কেমন অচেনা লাগত। নাটক, সিনেমার বড় বড় মানুষরা আসতেন। আমি চেয়ে থাকতাম। আস্তে আস্তে নাট্যদলের সব নিয়মকানুন ভালো লেগে গেল। ওখানে অনেক বন্ধুও জুটেছিল আমার।”

টোকাই নাট্যদলের হয়ে মেঘলা দুটি মঞ্চনাটকে অভিনয় করেছে। সবগুলোই শিশুতোষ নাটক। নাটক দুটি হল ‘নূরজাহান’ ও ‘পানা’। আগ্রাসী শহরায়নে শিশুদের খেলার মাঠ হারিয়ে যাওয়ার গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে নাটক ‘নূরজাহান’। ‘পানা’ নাটকটি নির্মিত হয়েছে টোকাইদের মানবেতর দিনযাপনের গল্প নিয়ে। এর মধ্যে ‘নূরজাহান’ নাটকের বেশকটি প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছে মেঘলা। মেঘলা জানায়, শিল্পকলা একাডেমি ও পাবলিক লাইব্রেরির বেশকটি শো এবং ভারতের একটি উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে ‘নূরজাহান’।পানা’ নাটকে মেঘলার অভিনয় দেখে মুগ্ধ হন অভিনেতা ও পরিচালক মাহফুজ আহমেদ। তার হাত ধরেই টিভি অভিনেত্রী হিসেবে যাত্রা শুরু করে মেঘলা।

সে গল্প শোনায় মেঘলা। সে বলে, “মাহফুজ আঙ্কেল আমার অভিনয় দেখে অনেক প্রশংসা করেছিলেন। তার ‘গ্রামের নাম খঞ্জনা’ নাটকে অভিনয়ের সুযোগ পেলাম। সে নাটকে আমার সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন সুবর্ণা মুস্তাফা।”

মেঘলার ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় নাটক মীর সাব্বিরের ‘মকবুল’। এ নাটকে সে বোবা চরিত্রে অভিনয় করে রীতিমতো সাড়া ফেলে দিল।

এরপর শিশু অভিনেত্রী হিসেবে ব্যস্ত হয়ে উঠল মেঘলা। মেঘলা এরপর অভিনয় করেছে ‘যাও পাখি’, ‘পাখির ডানা’, ‘সুবর্ণদিন’, ‘পুকুর’, ‘ভেলা’, ‘চোখের আলো’, ‘জননী’, ‘জবর ব্যাপার’ এবং ‘ফটোগ্রাফার’ নাটকে।

মেঘলা জানায়, একটা খাতায় সেসব নাটকের চরিত্র ও পরিচালকদের নামধাম লিখে রেখেছিল। কিন্তু বাসা পরিবর্তনের সময় কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেছে সে খাতাটি। হাসিমাখা মুখটি তখন কেমন অন্ধকার হয়ে গেল।

এবার চলচ্চিত্র প্রসঙ্গ। ‘উত্তরের সুর’ সিনেমার পরিচালক শাহনেওয়াজ কাকলীর সঙ্গে পরিচয় ‘আওলা বাতাস’ নাটকের মাধ্যমে। কাকলীর পরিচালনায় সে নাটকে দারুণ অভিনয় করে তার প্রথম সিনেমাতেও সুযোগ করে নেয় সে।

সিনেমার শুটিংয়ের স্মৃতিচারণ করে মেঘলা, “আয়েশা চরিত্রের জন্য দলের সবাই মিলে আমাকে তৈরি করেছে। এ সিনেমাতে আমি অভিনেতা উৎপল আঙ্কেল ও লুসি আন্টির মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করব। শুরুতেই তারা আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করেন। সিনেমার শুটিংয়ে বেশ কঠিন দৃশ্যগুলো বুঝিয়ে দিতেন তারা। তাদের কারণে কাজটা আমার জন্য সহজ হয়ে গিয়েছিল।”

‘মেয়ে তো জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার পেল। মেয়েকে নিয়ে কী ভাবছেন ?’– এ প্রশ্নের উত্তরে লাইজু বেগম বলেন, “জাতীয় পুরস্কার অবশ্যই আনন্দের ব্যাপার। তবে পুরস্কারের বিস্তারিত আমি জানি না। পুরস্কার বা টাকাপয়সা না, আমার মেঘলা ভালো অভিনয় করে দর্শকের মন জয় করবে, এটাই আমার স্বপ্ন। শাবনূর, মৌসুমীর মতো একদিন মেঘলার নামও বলবে তারা– এটাই আমি চাই। ”

সিনেমার গল্প শেষ। এবার জীবনের গল্প।

বাবা মুজিবুর রহমান জানালেন, ‘উত্তরের সুর’ সিনেমার মতো মেঘলাকে প্রায়ই দুমুঠো ভাতের জন্য কাঁদতে হয়। তিনি আগে সিএনজি চালাতেন। কিন্তু মেরুদণ্ডে আঘাত পাওয়ায় সে পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। তারপর স্ত্রীর সঙ্গে মিলে একটি দর্জি দোকান খুলেছেন। সে দোকানে ক্রেতা নেই তো ঘরে চাল বাড়ন্ত ! স্কুল  থেকে ফিরে মেঘলা দেখে চার বছর বয়সী ভাই মাহাদি ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাঁদছে। তখন নিজের ক্ষুধা ভুলে ভাইয়ের জন্য কাঁদতে শুরু করে মেঘলা।সংসারে নানা টানাপড়েনে দিশেহারা বাবা একদিন মেয়ের বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। সে খবর গোপন থাকে না মেঘলার স্কুলে। সবাই মিলে সেদিন রুখে দিয়েছিল একটি ‘করুণ’ বাল্যবিবাহ। প্রসঙ্গ উঠতেই মুজিবুরের চোখে-মুখে কেমন দোষী ভাব ফুটে ওঠে।

সংসারে এত টানাপড়েন, তা সত্তে¡ও মেঘলার স্বপ্ন দেখা থেমে নেই। পড়াশোনা ও অভিনয় চর্চা চলছে সমানতালে। মেঘলা এখন মোহাম্মদপুরের বেগম নূরজাহান মেমোরিয়াল উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে। ক্লাসে তার রোল ৪।

মেঘলা জানায়, স্কুলের বারেক স্যার ও সীমা ম্যাডাম তার অভিনয়ের দারুণ ভক্ত। অভিনয়ের ব্যাপারে অনেক উৎসাহ দেন তারা।

এদিকে মোহাম্মদপুরের নাচের স্কুল ওয়ার্ল্ড ভিশনে ভর্তি হয়েছে সে। মেহেদি হাসান সাজুর কাছে অভিনয় ও বিনয় সমাদ্দারের কাছে গান শিখছে সে। মেঘলার প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তার ফি মওকুফ করে দিয়েছেন তারা।

মেঘলা বলে, “যেভাবেই হোক, বাবার স্বপ্ন আমি পূরণ করবই।  বড় অভিনেত্রী হতে হবে আমাকে। তবে শুধু অভিনয়ই না, পড়াশোনাতেও মনযোগী হয়েছি। ভালো অভিনেত্রী হতে হলে অনেক পড়াশোনা করতে হবে আমাকে।”

ফেরার পথে বাবা মুজিবুর জানান, বস্তিঘরে মেয়েকে নিয়ে স্বস্তিতে নেই তিনি। মেয়ের সুস্থ বিকাশের জন্য একটি সুন্দর পরিবেশ দরকার।জলভরা চোখে তার আকুতি– “আমার মেয়ে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে, অথচ সে এই বস্তিঘরে পড়ে আছে। আমার সামর্থ্য নেই। কেউ যদি, আমার মেয়ের জন্য একটি সুন্দর পরিবেশ করে দিত! ”

You may also like

Leave a Comment


cheap mlb jerseyscheap nhl jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseys