সংবাদ সম্মেলনে খালেদার ঘোষণা-রোববার ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’

by News Room

আগামী রোববার (২৯ ডিসেম্বর) সারাদেশ থেকে ঢাকার দিকে অভিযাত্রার ঘোষণা দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া। এই অভিযাত্রার নাম ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’। সারাদেশ থেকে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে এই অভিযাত্রায় অংশ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে ঢাকাবাসীকেও ওই দিন রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিরোধীদলীয় নেতা সরকারকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন, এই অভিযাত্রা কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের হয়রানি করা হলে পরবর্তীতে আরো কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে। তিনি ঢাকা অভিমুখী অভিযাত্রা সফল করতে সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন।

মঙ্গলবার পঞ্চম দফা অবরোধের শেষ দিন গুলশানের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন। বিকেল পাঁচটা ৫০ মিনিটে শুরু হওয়া তার বক্তব্য শেষ হয় ছয়টা ৪৩ মিনিটে। ১৮ দলের আন্দোলন কর্মসূচির প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

দেশের সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে ঢাকায় আসার আহ্বান জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, “বিজয়ের এ মাসে সবাই রাজধানীতে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমবেত হবেন।” মা-বোন, ছাত্র-যুবক, কৃষক, আলেমসহ সবাইকে দলে দলে ঢাকায় আসার আহ্বান জানান খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, “বাসে-লঞ্চে যে যেভাবে পারেন, ঢাকা আসেন।”

দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র হুমকির মুখে উল্লেখ করে খালেদা জিয়া দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র কমিটি গঠনেরও আহ্বান জানান।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে। বাকি আসনগুলোতে যে নির্বাচন হবে সেখানে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে না। এতে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে না।” বিএনপির সঙ্গেও আসন ভাগাভাগির বিষয়ে শেখ হাসিনার ইঙ্গিতের কথা উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে প্রশ্ন রাখেন, “আসন ভাগাভাগির আপনি কে?”

খালেদা জিয়া বলেন, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগের নির্লজ্জ সিলেকশন। তারা গণতন্ত্রের পথ ছেড়ে স্বৈরাচারের পথ নিয়েছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন হলে তা হবে অবৈধ, অগণতান্ত্রিক ও অপ্রতিনিধিত্বশীল।

বক্তব্যের শুরুতে তিনি বলেন, দেশে এখন কেবল রক্ত ঝরছে। ঘরে ঘরে কান্নার রোল। শহর ছাড়িয়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের আনাচে-কানাচে। কিন্তু সরকার ভিনদেশী হানাদারের মতো ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখতে পোড়ামাটি নীতি অনুসরণ করছে।

সমঝোতার জন্য তার দল আন্তরিকতার সঙ্গে বারবার আহ্বান জানিয়েছে বলে দাবি করেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, নির্বাচনী সরকার নিয়ে তার দল একটি প্রস্তাব দিয়েছে, সংসদে গিয়েও এ ব্যাপারে প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আন্তরিকতা দেখানো হয়নি।

বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন, সরকারের সংলাপের প্রস্তাব ছিল প্রতারণামূলক ও লোকদেখানো। এমনকি তারানকোর সফরের পর দুই দলের তিন দফা বৈঠকের পরও সরকারের অনড় অবস্থানের কারণে সমঝোতা হয়নি।

খালেদা বলেন, সরকার একতরফা প্রহসনের নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে। প্রধান দুই দলের সমঝোতা ছাড়া কোনো নির্বাচন কিংবা ক্ষমতা হস্তান্তর গ্রহণযোগ্য হবে না। শুধু বিএনপি নয়, অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল এ নির্বাচন বর্জন করেছে।

কাদের মোল্লার ফাঁসি নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ে খালেদা জিয়া বলেন, “পাকিস্তানের সঙ্গে যেকোনো সমস্যা কূটনৈতিকভাবে সমাধান করা যায়। কিন্তু তা না করে দেশের ভেতরে তা নিয়ে নোংরা রাজনীতি করা হচ্ছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই।”
বক্তব্যের শেষ দিকে খালেদা জিয়া বিরোধী দলের চলমান আন্দোলনের চার দফা করণীয় ও নীতি-কৌশল তুলে ধরেন:

“ভোটাধিকার হরণকারী ও মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী সরকারের বিরুদ্ধে প্রাণক্ষয়ী লড়াইয়ে যারা শরিক আছেন এবং হচ্ছেন, তাদের মধ্যে সমন্বয়, সমঝোতা ও ঐক্য গড়ে তুলুন।

“বিভক্তি ও বিভাজনের বিষাক্ত রাজনীতির চির-অবসান ঘটানোর জন্য জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের মূল্য দিন। জাতীয় ক্ষেত্রে বিতর্কিত বিষয়সমূহ অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে আলাপ আলোচনা এবং গণভোটের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক পন্থায় মীমাংসার রাজনৈতিক সংকল্পকে জোরদার করুন। সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ যা চায় না, দেশের সংবিধানে তা থাকতে পারে না।

“ভোটকেন্দ্রভিত্তিক সংগ্রাম কমিটিগুলোর পাশাপাশি দেশ ও গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনরত সব পক্ষকে নিয়ে অবিলম্বে জেলা, উপজেলা ও শহরে ‘সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষা সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করে পাঁচ জানুয়ারি নির্বাচনী তামাশা প্রতিহত করুন। প্রতিটি জেলার প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখুন এবং জনগণের জান, মাল ও জীবিকার নিরাপত্তা বিধানের ক্ষেত্রে স্ব স্ব নাগরিক দায়িত্ব পালন করুন।

“গণতন্ত্রের এই সংগ্রামে সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বী, সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে যুক্ত করার পাশাপাশি তাদের জানমালের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের সরকারি ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখুন, সজাগ থাকুন। কোনোরকম সাম্প্রদায়িকতা বরদাশত করবেন না।”

অবরোধ-পরবর্তী আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করে খালেদা জিয়া বলেন, “আন্দোলনকে আরো বিস্তৃত, ব্যাপক ও পরবর্তী ধাপে উন্নীত করার লক্ষ্যে আমি আগামী ২৯ ডিসেম্বর  রোজ  রোববার সারাদেশ থেকে দলমত, শ্রেণী-পেশা, ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সক্ষম নাগরিকদের রাজধানী ঢাকা অভিমুখে অভিযাত্রা করার আহ্বান জানাচ্ছি। এই অভিযাত্রা হবে নির্বাচনী প্রহসনকে ‘না’ বলতে, গণতন্ত্রকে ‘হ্যাঁ’ বলতে। এই অভিযাত্রা হবে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অর্থবহ নির্বাচনের দাবিতে। এই অভিযাত্রা হবে শান্তি, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারের পক্ষে। এই অভিযাত্রা হবে ঐতিহাসিক। আমরা এই অভিযাত্রার নাম দিয়েছি ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’, গণতন্ত্রের অভিযাত্রা।”

খালেদা বলেন, “আমার আহবান, বিজয়ের মাসে লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা হাতে সকলেই ঢাকায় আসুন। ঢাকায় এসে সবাই পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মিলিত হবেন।

“আমার আহ্বান, এই অভিযাত্রায় ব্যবসায়ীরা আসুন, সিভিল সমাজ আসুন, ছাত্র-যুবকেরাও দলে দলে যোগ দাও।

“মা-বোনেরা আসুন, কৃষক-শ্রমিক ভাই-বোনেরা আসুন, কর্মজীবী-পেশাজীবীরা আসুন, আলেমরা আসুন, সব ধর্মের নাগরিকেরা আসুন, পাহাড়ের মানুষেরাও আসুন। যে যেভাবে পারেন, বাসে, ট্রেনে, লঞ্চে, অন্যান্য যানবাহনে করে ঢাকায় আসুন। রাজধানী অভিমুখী জনস্রোতে শামিল হোন।”

একই সঙ্গে রাজধানীবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, “আপনারাও সেদিন পথে নামুন। যারা গণতন্ত্র চান, ভোটাধিকার রক্ষা করতে চান, যারা শান্তি চান, যারা গত পাঁচ বছরে নানাভাবে নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, শেয়ারবাজারে ফতুর হয়েছেন, সকলেই পথে নামুন।”

জনতার এ অভিযাত্রায় কোনো বাধা না দেয়ার জন্য সরকারকে আহ্বান জানান বেগম জিয়া। তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, “যানবাহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ করবেন না। নির্যাতন, গ্রেফতার, হয়রানির অপচেষ্টা করবেন না। প্রজাতন্ত্রের সংবিধান নাগরিকদের শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হবার অধিকার দিয়েছে। সেই সংবিধান রক্ষার শপথ আপনারা নিয়েছেন। কাজেই সংবিধান ও শপথ লঙ্ঘন করবেন না।”

শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনে বাধা এলে জনগণ তা মোকাবিলা করবে এবং পরবর্তী সময়ে কঠোর কর্মসূচি দেয়া ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না বলে সরকারকে হুঁশিয়ার করে দেন বিরোধীদলীয় নেতা। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি সফল করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়ার আহ্বান জানান।

You may also like

Leave a Comment


cheap mlb jerseyscheap nhl jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseys