বিচারপতি অপসারণ ক্ষমতা: সংসদে উঠল ষোড়শ সংশোধন বিল

by News Room

সিলেটের খবর ডেস্ক: উচ্চ আদালতের বিচারকদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে দিতে জাতীয় সংসদে তোলা হয়েছে ‘সংবিধান (ষোড়শ সংশোধন) বিল-২০১৪’।
বিলটি পরীক্ষা করে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।

রোববার সন্ধ্যায় দশম জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক বিলটি তোলেন। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশনে সংসদ নেতা শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ এ সময় সংসদে উপস্থিত ছিলেন।

আইনমন্ত্রী বিলটি তোলার সময় সরকারি দলের পাশাপাশি সংসদের বিরোধী দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তা সমর্থন করেন।

গত ১৮ আগস্ট সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীসংক্রান্ত বিলটি মন্ত্রিসভার অনুমোদন পায়। বিলটি চলতি অধিবেশনেই পাস করা হবে বলে তখন গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন  আইনমন্ত্রী।

ষোড়শ সংশোধনী বিলটি পাস হলে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপিত হবে। তাতে বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা ফিরে পাবে সংসদ। একই সঙ্গে মহাহিসাব নিরীক্ষক, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার, সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান, সদস্যসহ অন্যান্য সাংবিধানিক পদের ব্যক্তিদের অপসারণের ক্ষমতাও সংসদের কাছে ন্যস্ত হবে।

সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, একজন বিচারক ৬৭ বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত নিজ পদে বহাল থাকবেন। প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের কারণে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশের প্রস্তাবক্রমে রাষ্ট্রপতির আদেশে কোনো বিচারককে অপসারণ করা যাবে। এ ছাড়া কোনো বিচারক রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ করে স্বাক্ষরযুক্ত চিঠি দিয়ে পদত্যাগ করতে পারবেন।

বিলের উদ্দেশ্যের বিষয়ে বলা হয়েছে, ৭২-এর সংবিধানে অনুচ্ছেদ ৭-এর (সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ)বিধানমতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে রক্ষিত ছিল। কিন্তু পরে বিচারপতিদের অপসারণের বিধান সামরিক ফরমানের মাধ্যমে পরিবর্তন করে  সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ওপর দেয়া হয়, যা সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭-এর চেতনার পরিপন্থী।

ষোড়শ সংশোধনের পর সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৬ প্রতিস্থাপিত হবে। এটি নিম্নরূপ-
৯৬। বিচারকের পদের মেয়াদ: (১) এই অনুচ্ছেদের বিধানাবলী সাপেক্ষে কোনো বিচারক ৬৭ বৎসর বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত স্বীয় পদে বহাল থাকিবেন।

(২) প্রমাণিত অসদাচারণ বা অসামর্থ্যের কারণে সংসদের মোট সদস্য-সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ব্যতীত কোনো বিচারককে অপসারিত করা যাইবে না।

(৩) এই অনুচ্ছেদের (২) দফার অধীন প্রস্তাব সম্পর্কিত পদ্ধতি এবং কোনো বিচারকের আসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করিবেন।

(৪) কোনো বিচারক রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ করিয়া স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয় ত্যাগ করিতে পারিবেন।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধণের কারণ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিলটিতে বলা হয়েছে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ এর বিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং তাদের পক্ষে এই ক্ষমতার প্রয়োগের কেবল সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হবে। এর প্রতিফলনে ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত রাষ্ট্রপতিকে সংসদ কর্তৃক অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারণ (অনুচ্ছেদ ৫২), সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারালে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ (অনুচ্ছেদ ৫৭), সংসদ সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থিত প্রস্তাবের মাধ্যমে স্পিকারকে অপসারণ (অনুচ্ছেদ ৭৪) এবং সংসদের মোট সদস্যসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত প্রস্তাবের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণের বিধান (অনুচ্ছেদ ৯৬) ছিল।

রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারকে, যথাক্রমে অভিশংসন, পদত্যাগ ও অপসারণ-সম্পর্কিত পূর্ববর্তী বিধান এখন পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকলেও সামরিক শাসকের মাধ্যমে অসাংবিধানিক পন্থায় সামরিক ফরমানের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের অভিযোগে সংসদের মাধ্যমে অপসারণের বিধান পরিবর্তনক্রমে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং অপর দুজন প্রবীণ বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ওপর ন্যস্ত করা হয়, যা সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭-এর চেতনার পরিপন্থী। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে গঠিত সংসদে রাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গের মতো উচ্চ আদালতের বিচারকদের জবাবদিহিতার নীতি বিশ্বের অধিকাংশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিদ্যমান রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে, ১৯৭২ সালের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৬ পুনঃপ্রবর্তনের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের সংসদের মাধ্যমে অপসারণের বিধান পুনঃপ্রবর্তনের মাধ্যমে অনুচ্ছেদ ৭-এর চেতনা পুনর্বহালের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে সংবিধান (ষোড়শ সংশোধন) আইন ২০১৪-এর উত্থাপন করা হয়েছে। বিলটি আইনে পরিণত হলে স্বাধীন বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা আরো বৃদ্ধির পাশাপাশি জনপ্রতিনিধির নিকট তার জবাবদিহিতা থাকাসংক্রান্ত সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সমুন্নত থাকবে।

বর্তমান সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদে যা বলা হয়েছে:
৯৬। (১) এই অনুচ্ছেদের অন্যান্য বিধানাবলী সাপেক্ষে কোনো বিচারক ৬৭ বৎসর বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত স্বীয় পদে বহাল থাকিবেন।

(২) এই অনুচ্ছেদের নিম্নরূপ বিধানাবলী  ব্যতীত কোনো বিচারককে তাহার পদ হইতে অপসারিত করা যাইবে না।

(৩) একটি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল থাকিবে যাহা এই অনুচ্ছেদে ‘কাউন্সিল’ বলিয়া উল্লেখিত হইবে এবং বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারকের মধ্যে পরবর্তী যে দুইজন কর্মে প্রবীণ তাহাদের লইয়া গঠিত হইবে।

তবে শর্ত থাকে যে, কাউন্সিল যদি কোনো সময়ে কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন এইরূপ কোনো বিচারকের সামর্থ্য বা আচরণ সম্পর্কে তদন্ত করেন, অথবা কাউন্সিলের কোনো সদস্য যদি অনুপস্থিত থাকেন অথবা অসুস্থতা কিংবা অন্য কোনো কারণে কার্য করিতে অসমর্থ্য হন তাহা হইলে কাউন্সিলের যাহারা সদস্য আছেন তাহাদের পরবর্তী যে বিচারক কর্মে প্রবীণ তিনিই অনুরূপ সদস্য হিসাবে কার্য করিবেন।

(৪) কাউন্সিলের দায়িত্ব হইবে-

(ক) বিচারকগণের জন্য পালনীয় আচরণবিধি নির্ধারণ করা; এবং

(খ) কোনো বিচারকের অথবা কোনো বিচারক যেরূপ পদ্ধতিতে অপসারিত হইতে পারেন সেইরূপ পদ্ধতি ব্যতীত তাহার পদ হইতে অপসারণযোগ্য নহেন এইরূপ অন্য কোনো পদে আসীন ব্যক্তির সামর্থ্য বা আচরণ সম্পর্কে তদন্ত করা।

(৫) যে ক্ষেত্রে কাউন্সিল অথবা অন্য কোনো সূত্র হইতে প্রাপ্ত তথ্যে রাষ্ট্রপতির এইরূপ বুঝিবার কারণ থাকে যে, কোনো বিচারক-

(ক) শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যরে কারণে তাহার পদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করিতে অযোগ্য হইয়া পড়িতে পারেন, অথবা

(খ) গুরুতর অসদাচরণের জন্য দোষী হইতে পারেন, সেই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি কাউন্সিলকে বিষয়টি সম্পর্কে তদন্ত করিতে ও উহার তদন্ত ফল জ্ঞাপন করিবার জন্য নির্দেশ দিতে পারেন।

(৬) কাউন্সিল তদন্ত করিবার পর রাষ্ট্রপতির নিকট যদি এইরূপ রিপোর্ট করেন যে, উহার মতে উক্ত বিচারক তাহার পদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে অযোগ্য হইয়া পড়িয়াছেন অথবা গুরুতর অসদাচরণের জন্য দোষী হইয়াছেন তাহা হইলে রাষ্ট্রপতি আদেশের দ্বারা উক্ত বিচারককে তাহার পদ হইতে অপসারিত করিবেন।

(৭) এই অনুচ্ছেদের অধীনে তদন্তের উদ্দেশ্যে কাউন্সিল স্বীয় কার্য-পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ করিবেন এবং পরওয়ানা জারি ও নির্বাহের ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের ন্যায় উহার একই ক্ষমতা থাকিবে।

(৮) কোনো বিচারক রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ করিয়া স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয় পদ ত্যাগ করিতে পারিবেন।

You may also like

Leave a Comment


cheap mlb jerseyscheap nhl jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseys