‘বাহিরে খন্দকার, ভেতরে মোস্তাক’ নামে বই লিখছেন কাদের সিদ্দিকী

by News Room

সিলেটের খবর ডেস্ক: মুক্তিযুদ্ধের উপপ্রধান সেনাপতি এবং সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) একে খন্দকার, বীর উত্তমকে ‘অথর্ব’ এবং মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার কে এম শফিউল্লাহ বীর উত্তমকে ‘কাপুরুষ’ বলে মন্তব্য করেছেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম।

সোমবার নয়াদিগন্ত পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে কাদের সিদ্দিকী এ মন্তব্য করেন।

কাদের সিদ্দিকী লিখেছেন, ‘জীবনে পবিত্র কুরআন ছাড়া আর কোনো গ্রন্থ অতবার পড়িনি, যা এ কে খন্দকারের ‘১৯৭১ ভেতরে বাইরে’ এ ক’দিনে পড়েছি। পাঠকের সামনে কিছু প্রশ্ন তুলে ধরতে বইটা পড়ার প্রয়োজন ছিল। এত ‘অথর্বরা’ যে অত বড় বড় দায়িত্বপূর্ণ পদে এতদিন দাপিয়ে বেড়িয়েছেন ভাবতেই কেন যেন অবাক লাগে। সত্যিই কেউ ভাবতে পারে? শত্রু কবলিত দেশে ওরকম একটা লাখ লাখ লোকের সমাবেশে স্বাধীনতা ঘোষণা করা যায়? তারপরও ছক্কল ধরেছেন তারা নির্দেশ পায়নি। ইচ্ছে না থাকলে পাবেন কী করে?’

নিয়মিত কলামে কাদের সিদ্দিকী আরো লিখেছেন, ‘ভদ্রলোকেরা কয়েক বছর এক দোকান খুলেছেন ‘কমান্ডার্স ফোরাম’। যুদ্ধের বেলায় কমান্ড নেই, কমান্ডার্স ফোরাম! ফোরাম থেকে পদত্যাগ করেছেন। এখন সভাপতি আরেক কাপুরুষ। হাইকোর্ট যাকে অথর্ব কাপুরুষ হিসেবে আগেই রায় দিয়েছেন। সেই জেনারেল শফিউল্লাহ এখন কমান্ডার্স ফোরামের সভাপতি।’

তিনি লিখেছেন, ‘লোকগুলোর যখন যৌবন ছিল, কার্যশক্তি ছিল, তখন জিয়া-এরশাদের গোলামি করেছেন।’

বঙ্গবন্ধুকে সম্বোধন করে লেখা এই নিবন্ধে বলা হয়, ‘এখন সবাই তোমার (বঙ্গবন্ধুর) কন্যার অধীন। একটা মজার ব্যাপার! তোমাকে যারা গালাগাল করেছে এখন তারা সবাই তোমার কথা বলতে বলতে কাঁদতে কাঁদতে নাকের চোখের নোনা পানি হজম করছে। এ জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বোনকে অবশ্যই ধন্যবাদ দিতে হয়। …তবে মাঝে মাঝে ভয় যে হয় না তা নয়। চার দিকে শত্রুর মধ্যে প্রিয়জন কেউ থাকলে তার জন্য সত্যিই শঙ্কা হয়।’

বঙ্গবীর লিখেছেন, ‘সম্প্রতি বহুল আলোচিত এ কে খন্দকারের বইয়ে তার খেতাব পাওয়া নিয়ে দু’কথা আলোকপাত করি। এ কে খন্দকার ‘১৯৭১ ভেতরে বাইরে’ লিখে মুক্তিযুদ্ধের মহিমাকে বরবাদ করেছেন। আমি চেষ্টা করছি ‘বাহিরে খন্দকার, ভেতরে মোস্তাক’ নামে একটা বই লিখতে। লেখার কাজ প্রায় শেষ। শুধু চোখ বুলানো বাকি। আশা করি ইনশাআল্লাহ কোরবানি ঈদের এক সপ্তাহের মধ্যে শেষ করে ফেলব। তাই সেখানে ১৪ পর্বের বইয়ের সব ক’টা পর্ব নিয়েই কমবেশি আলোচনা করব। তুমি তো জানই, জনাব খন্দকার একজন বীর উত্তম খেতাবধারী। খেতাবপ্রাপ্ত না বলে খেতাবধারী বললাম, মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ খেতাব প্রদানে তিনি ছিলেন চেয়ারম্যান, মেজর এম এ ওসমান ও মেজর এম এ মঞ্জুর ছিলেন সদস্য। তারা তিনজনই নিজেদেরটা নিজেরাই নিয়ে নিয়েছেন। তবে ওইসব বীরত্বসূচক খেতাব পাওয়ার জন্য যা যা দলিল দস্তাবেজ থাকা দরকার, যে ধরনের ঘটনা বা যুদ্ধে সাহস দেখানো দরকার তার কিছুই উল্লেখ নেই। মুক্তিযুদ্ধে কোনো ভূমিকা থাকলে তো উল্লেখ থাকবে।’

কাদের সিদ্দিকী জানান, ‘স্বাধীনতাযুদ্ধে বীরত্বসূচক পদক বা খেতাব পেতে প্রধান সেনাপতি জনাব এম এ জি ওসমানীর যে প্রস্তাব সরকার অনুমোদন করেছিল, সেখানে ছিল সম্মুখযুদ্ধে সাহসী কর্মকাণ্ডের জন্য যোদ্ধাদের উৎসাহিত করতে পদক দেয়া। বীরত্বসূচক পদকের প্রধান শর্ত হবে সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ। সেটা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করে অথবা শত্রুকে আক্রমণ করে হোক। যেভাবেই হোক যুদ্ধে অংশ নিতে হবে। যে কারণে জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী প্রধান সেনাপতি হয়েও খেতাব পাননি বা নেননি।’

কাদের সিদ্দিকী লিখেছেন, দেশ আবার উত্তাল হতে যাচ্ছে। সে দিন দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর যুদ্ধাপরাধ মামলায় ফাঁসির বদলে আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়েছে। এ এক চমৎকার সাজা। ৯০ বছর বয়সে গোলাম আযমের ৯০ বছর জেল। আজীবন কারাদণ্ড হয়েছিল জয়পুরহাটের কসাই আব্দুল আলীমের। ক’দিন আগে ভদ্রলোক ইন্তেকাল করে পরপারে গেছেন। সে দিন কারাদণ্ড হয়েছে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর। অনেকে মনে করছেন বহু ঘাটে যুক্ত জামায়াতে ইসলামীর সাথে এটা একটা আপসের প্রয়াস। আবার সরকার অন্যভাবেও দেখতে পারে। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর জামায়াতের বাইরেও একটা ধর্মীয় আবেগ আছে। সেটা যাতে বিস্ফোরিত না হয় তার জন্যও কৌশল নিতে পারেন। যাই হোক, এখন দেশের মানুষ সরকারি চালাকি আগেই ধরে ফেলে। আর ডিজিটাল জামানায় কোনো কিছু গোপন থাকে না, সবই ওপেন সিক্রেট। কে কার সাথে কথা বলে, কী বলে, কী সব কাগজপত্র আদান প্রদান হয় ইন্টারনেটের কল্যাণে তার অনেক কিছুই ধরা পড়ে। তাই বেশি চালাকির সুযোগ কই।

নিবন্ধে বলা হয়, বহু বছর ধরে শুনে আসছি, অতি চালাকের গলায় দড়ি। এখন অনেকের গলায় সেই দড়ি পরছে। সরকার সত্যিই একটা বুদ্ধির কাজ করেছে। এ সরকার থাকলে জেলে, অন্য সরকার এলে দু’চার মাস পর জাতীয় হিরো হয়ে বাইরে। শুনেছি, আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় শুনে মহিলা প্রসিকিউটর জ্ঞান হারিয়েছেন। তা তিনি হারাতেই পারেন। জ্ঞান হারালেই কোনো যোগ্যতা প্রমাণ হয় না। অমন ঢংয়ের অজ্ঞান অনেকেই হতে পারে। তবে এটা সত্য, যুদ্ধাপরাধী অভিযোগে অভিযুক্ত সবার অপরাধ প্রমাণ হবে না। কেউ কেউ মুক্তও হবেন। সবার দণ্ড ফাঁসি হবে না, কমবেশি কারাদণ্ডও হবে- এটাই আইনের বিধান।কাদের সিদ্দিকী লিখেছেন, খন্দকার কী কাজের জন্যে বীর উত্তম হলেন বা খেতাব পেলেন বা নিলেন তার বইয়ে যা লিখেছেন তা আমি তোমায় জানিয়েছি। এরকম বউ-পোলাপান নিয়ে ভারত গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম লেখালেই যদি খেতাব পাওয়া যায় তাহলে আরো কয়েক লাখ যোদ্ধাকে খেতাব দিতে হয়। হ্যাঁ, তিনি খেতাব পেতে পারতেন, ’৫১ সালে চাকরিতে যোগ দিয়ে পাকিস্তানে যাওয়ার পর ’৬৯ সালের ৪ মার্চ ঢাকায় আসেন। তিনি তখন উইং কমান্ডার হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি বিমান কর্মকর্তা হিসেবে সর্বজ্যেষ্ঠ হিসেবে দাবি করেছেন। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদাররা বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে তিনি যদি তার পুরো স্কোয়াড্রন নিয়ে সীমান্ত পার হতেন তাহলে তাকে বীর উত্তম দিলে কারো কোনো আপত্তি থাকত না। সব ক’টা না পারতেন অন্তত একটা বিমান নিয়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে একটা বোমা ফেলে চলে যেতেন। বোমা না ফেলতে পারলেও কোনো আপত্তি ছিল না, তিনি একটা বিমান নিয়ে গেলেই হতো। যুদ্ধরত অবস্থায় যদি শুনতাম আমাদের কোনো বাঙালি বিমানকর্তা কয়েকটা বিমান উড়িয়ে দিয়েছে কিংবা জ্বালিয়ে দিয়েছে বা বিমান নিয়ে বন্ধুরাষ্ট্র ভারতে চলে গেছে তাহলে কতই-না শক্তি পেতাম। এর কিছুই তিনি করেননি বা করতে পারেননি। আর কিছু না পারতেন ৫-১০টা ফাইটারের তেলের ট্যাংকে এক ছটাক চিনি ঢেলে যেতেন- তা-ও বুঝতাম একটা কিছু করেছেন। কোনো জেড-এর ট্যাংকে এক ছটাক চিনি দিলে আর দয়া করে একবার ইঞ্জিন স্টার্ট করে ২-৪ মিনিট চালালে তারপর কাউকে আর কিছু করতে হতো না। আপনা আপনিই ইঞ্জিন সিজ হতো। আবার নতুন ইঞ্জিন বসিয়ে তারপর সে ফাইটার দিয়ে ফাইট করতে হতো। আমি বলতে চাইনি স্ত্রী-ছেলে-মেয়ে, বন্ধু-বান্ধব ত্যাগ করে আমাদের মতো অনিশ্চিত জীবনে ঝাঁপিয়ে পড়তে; কিন্তু বীর উত্তম খেতাব যখন নিবেন তখন তো বীরের মতো কিছু একটা করতে হবে। তা তো বাহিরে খন্দকার ‘১৯৭১ ভেতরে বাইরে’ দেখাতে পারেননি।

 

কাদের সিদ্দিকী লিখেছেন, দরিদ্র মানুষের রক্ত-ঘামের পয়সায় জনতা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান জনাব অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত পণ্ডিতি করে ২০১২ সালে ‘একাত্তরের বীরযোদ্ধাদের অবিস্মরণীয় জীবনগাথা খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা স্মারক গ্রন্থে’ লিখেছেন, ১৬ই ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এম এ জি ওসমানীসহ হেলিকপ্টার যোগে ঢাকায় আসার পথে ফেঞ্চুগঞ্জে তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে আব্দুর রব পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। এ জন্য যদি তাকে বীর উত্তম খেতাব দেয়া হয়ে থাকে পণ্ডিতেরা দিতেই পারেন; কিন্তু হেলিকপ্টারে কোথাও যাওয়ার পথে গুলি খাওয়া যুদ্ধ বোঝায় না। আর জেনারেল ওসমানীকে বহন করা হেলিকপ্টার কোনোমতেই ঢাকার পথে ছিল না। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের স্থানীয় ক্যাম্প বা ঘাঁটি পরিদর্শন করছিলেন। সবাই এসেছিলেন আগরতলা থেকে, তারা কেন ভাঙা হেলিকপ্টারে সিলেট থেকে এতিমের মতো আসার চেষ্টা করবেন? সেখান থেকে আগরতলা হয়ে সবার একসাথে আসাই তো সমীচীন ছিল। এ তো দেখছি ক্যান্সারের মতো ইতিহাস বিকৃতির রোগে ধরেছে।

 

আর মুক্তিবাহিনী কখনো এক কথা নয়। আমাদের বহু পণ্ডিত জনাব আতাউল গনি ওসমানীকে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি যেমনটা এখানে বলেছেন অথবা সর্বাধিনায়ক বলতে চান। তিনি মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের নন। মুক্তিযুদ্ধটা একটা সার্বিক ব্যাপার। সেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, আরো অনেক কিছু জড়িত। যুদ্ধটা তার একটা অংশ।

You may also like

Leave a Comment


cheap mlb jerseyscheap nhl jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseys