প্রেমিক জীবনানন্দ দাশ : তাঁর কাব্যে নারী

by News Room

আমেনা আফতাব:-জীবনানন্দ দাশ হেয়ালির কবি। তাঁর কাব্যে প্রেম ভালোবাসার সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা না গেলেও প্রণয়িনীকে কবি পাশে রেখেছিলেন। নিসর্গ প্রকৃতিতে কবির অবাধ বিচরণ, নক্ষত্র লোকে কথোপকথন, নদীর কাছে প্রশ্ন রাখা এসবের সাক্ষী রূপে প্রণয়িনীকেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন। তার দয়িতা এক রহস্যময়ী যিনি শুধু নীরবে অবলোকন করেছেন কবির জগৎকে। তাঁর কথা বলার ক্ষেত্র কবি তৈরি করার প্রয়োজন মনে করেননি। কিন্তু কবির উপলব্ধির মাঝে তিনি অবহেলিত, একথাও বলা যাবে না। বরঞ্চ তাকে নিবিড়ভাবে অবলোকন করা যায়।
সেদিক থেকে জীবনানন্দ দাশের কার্পণ্য ছিল না মোটেও। তাঁর নীরব বন্দনা পাঠকের মনে রেখাপাত করে বৈকি। তুমি তা জানো না কিছু না জানিলে, আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে; কার জন্য কবির সকল গান। কেউ একজন ছিল তো নিশ্চয় তার হৃদয়ের মণিকোঠায়। যাকে তিনি নিঃসঙ্কোচে বলতে পেরেছেন- ‘যখন ঝরিয়া যাব হেমন্তের ঝড়ে / পথের পাতার মতো তুমিও তখন / আমার বুকের’ পরে শুয়ে রবে / অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মন / সেদিন তোমার।’ (নির্জন স্বাক্ষর) কার যেন পথ চেয়েছিলেন কবি। পঁচিশ বছর আগে দেখা হয়েছিল তার সাথে। অতি উচ্ছলতা দেখাননি কিন্তু অভিমানী আমন্ত্রণ ছিল যা আমাদের হৃদয়ে দাগ কাটে, ব্যথিত করে তোলে- ‘শেষবার তার সাথে যখন হয়েছে দেখা মাঠের উপরে বলিলাম একদিন এমন সময়, আবার আসিয়ো তুমি আসিবার ইচ্ছা যদি হয় পঁচিশ বছর পরে।’ (পঁচিশ বছর পরে) কবি পথ চেয়েছিলেন।
কিন্তু দেখা মেলেনি তার দয়িতার- ‘নক্ষত্র যে বেগে ছুটিছে আকাশে / তার চেয়ে আগে চলে আসে / যদিও সময়, পঁচিশ বছর তবু কই শেষ হয়।’ কিন্তু একদিন তাঁর মনে হল পঁচিশ বছর তবু গেছে কেটে। কবি হৃদয়ের রক্তক্ষরণ তবু টের পেতে দিলেন না পাঠককে, জগৎ জীবনকে। নিষ্পৃহই থেকে গেলেন। প্রেমের ব্যাপারে এই নিষ্পৃহতাই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে জীবনানন্দ দাশের নান্দনিক কাব্যে।নিসর্গের রাজ্যে বিচরণকারী কবি যদিও পার্থিব কিছুর জন্য লালায়িত ছিলেন না, তথাপি অতি সন্তর্পণে বিনম্র এক কামনাকে তিনি কখনও কখনও তোলে ধরেছেন যে কষ্টটাকে তিনি তাঁর একার বলেই মেনে নিয়েছেন। কার জন্য যেন তার নীরব আকুতি, কার জন্য গান গাওয়া- ‘আমার এ গান / কোনোদিন শুনিবে না তুমি এসে / আজ রাতে আমার আহবান / ভেসে যাবে পথের বাতাসে, / তবুও হৃদয়ে গান আসে। / তবু ভালোবাসা জেগে থাকে প্রাণে।’ (সহজ) কে সে? যার জন্য কবির এ বেদনাবোধ। কবি তাকে চেনেন- নিঃসঙ্গ বুকের গানে / নিশীথের বাতাসের মতো। / একদিন এসেছিলে, / দিয়েছিলে এক রাত্রি দিতে পারে যত। কয়েকটি লাইন কবিতার ছত্রে আছে যে কবি পেয়েছে শুধু যন্ত্রণার বিষ / শুধু জেনেছে বিষাদ… কে সেই কবি? কিসের এ যন্ত্রণা তাঁর? ব্যর্থ প্রেমের, না কোনো মানবীকে হারানোর যন্ত্রণা। সাগরে সাগরে নাবিক মনা কবির অশেষ যাত্রা। সেখানেও তিনি খুঁজেছেন হারিয়ে যাওয়া কোনো একজনকে- ‘তোমারে পাব কি আমি কোনোদিন? / আমার নিকট থেকে, / তোমাকে নিয়েছে কেড়ে কখন সময়। / একদিন দিয়েছিল যেই ভালোবাসা, / ভুলে গেছে আজ তার ভাষা। / জানি আমি, তাই / আমিও ভুলিয়া যেতে চাই। কিন্তু ভুলে যেতে পারেননি কবি, তাই বলতে পেরেছেন- ‘ আমার এ নক্ষত্রের রাত / হয়তো সরিয়া গেছে-তবু তুমি আসিবে হঠাৎ’ (কয়েকটি লাইন) কবি লিখে গেছেন- ‘যে নারীর মতো এই পৃথিবীতে কোনোদিন কেউ নেই আর সে এসে মনকে নীল রৌদ্রনীল শ্যামলে ছড়ানো কবে যেন-আজকে হারিয়ে গেছে সব;’ ভুলে গেছি পটভূমি-ভুলে গেছি কে যে সেই নারী (দু’দিকে) এমন কোন নারী এসেছিলো কবির জীবনে যার জন্য তার দীর্ঘশ্বাস শুনতে পাই। জীবনানন্দ দাশের সে কবিতায় আমরা আর এক নারীর কথা পড়তে পারি, সে নেপথ্যে থেকে আমাদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়।
কবি সেখানে বলেছেন- ‘আমাকে সে নিয়েছিলো ডেকে;/ বলেছিলো এ নদীর জল / তোমার চোখের মতো ম্লান বেতফল / সব ক্লান্তি রক্তের থেকে / স্নিগ্ধ রাখছে পটভূমি; / এই নদী তুমি।’ হেয়ালির কবি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছেন- ‘গভীর মেয়েটি এসে দিয়েছিলো নাম। / আজো আমি মেয়েটিকে খুঁজি; / জলের অপার সিঁড়ি বেয়ে / কোথায় যে চলে গেছে মেয়ে (সে)। অনেক ক্ষেত্রে কবি প্রেম ভালোবাসার মায়াজাল বিস্তার করেছেন। প্রেয়সীকে হাজির করেছেন কিন্তু তাকে ছুঁয়ে দেখতে দেননি। স্পষ্ট দেখা যায় কিন্তু ধরা যায় না কবির মানবীকে। কিন্তু কবি তার অপেক্ষায় কাটিয়েছেন জীবন।‘বসে আছি; সমুদ্রের জলে / দেহ ধুয়ে নিয়া / তুমি কি আসিবে কাছে প্রিয়া’ (১৩৩৩) নারী প্রেম ভালোবাসা সম্পর্কে দারুণ এক অভিজ্ঞতার কথাও বলেছেন জীবনানন্দ দাশ- ‘ভালোবেসে দেখিয়াছি মেয়ে মানুষেরে / অবহেলা করে আমি দেখিয়াছি মেয়ে মানুষেরে / ঘৃণা করে দেখিয়াছি মেয়ে মানুষেরে’ (বোধ)। এবং এসবের বিনিময়ে কবি কি পেয়েছেন? সে প্রত্যুত্তরও তিনি দিয়েছেন- ‘আমারে সে ভালোবাসিয়াছে, আসিয়াছে কাছে, / উপেক্ষা সে করেছে আমারে, / ঘৃণা করে চলে গেছে-যখন ডেকেছি বারে বারে ভালোবেসে আরো।’ কিন্তু জীবনানন্দ দাশ অকপটে স্বীকার করেছেন-মানুষকে নয়, নারী, শুধু তোমাকে ভালোবেসে, বুঝেছি নিখিল বিশ্ব কী রকম মধুর হতে পারে। (তোমাকে) জীবনানন্দ দাশ অপরূপ পরিবেশে এক নারীকে আবিস্কার করেছিলেন হেমন্তের পাতা ঝরা দিনে।
কবির বর্ণনায় সে নারীকে দেখা যায়- হলুদ রঙের শাড়ি চোরকাঁটা বিঁধে আছে, / এলোমেলো অঘ্রাণের খড় / চারিদিকে শূন্য থেকে ভেসে এসে / ছুঁয়ে যেনে যেতেছে শরীর,/ চুলের উপর তার কুয়াশা রেখেছে হাত, / ঝরিছে শিশির। জীবনানন্দ দাশের অনেক কবিতায় আমরা শান্ত স্নিগ্ধ বিনম্র নারীকে দেখতে পাই, নারীর উপস্থিতি মনে দাগ কাটার মতো। নারীকে বেশির ভাগ সময় প্রকৃতির সৌন্দর্যে সাজিয়ে তুলেছেন কবি। আমরা যদি তার ‘জর্নাল ১৩৪৬’ কবিতাটিতে আসি তবে দেখতে পাই তেমন এক নারীকে ‘আজকে অনেক দিন পর আমি বিকেল বেলা তোমাকে পেলাম কাছে, দু’জনে হাঁটছি ভরা প্রান্তরের কোল থেকে আরো দূর প্রান্তরের ঘাসে, উশখুন্ড খোঁপা থেকে পায়ের নখটি আজ বিকেলের উৎসাহী বাতাসে সচেতন হয়ে উঠে আবার নতুন করে চিনে নিতে থাকে এই ব্যাপ্ত পটভূমি, মহা ঘুমে খেয়ালীর ডাকে।হঠাৎ বুকের কাছে সব খুঁজে পেয়ে। ‘তোমার পায়ের শব্দ’ বলে সে, ‘যেদিন শুনিনি মনে হতো ব্রহ্মান্ডের পরিশ্রম ধুলোর কণার কাছে তবু কিছু ঋণী, ঋণী নয়? সময় তা বুঝে নেবে’ কার মনে এমন করে ধরা পড়েছিলেন কবি। তাঁর এ স্বপ্নের নারীকে আরো সুন্দর করে তোলে ধরেছেন কবি- রাত্রি হয়ে গেলে তার উৎসারিত অন্ধকার জলের মতন কী এক শান্তির মতো স্নিগ্ধ হয়ে আছে এই মহিলার মন দ্রোণ ফুল লেগে আছে মেরুন শাড়িতে তার -নিম আমলকী পাতা হালকা বাতাসে চুলের ওপরে উড়ে উড়ে পড়ে-মুখে চোখে শরীরের সর্বস্বতা ভরে, কঠিন এ সামাজিক মেয়েটিকে দ্বিতীয় প্রকৃতি মনে করে। অন্ধকার থেকে খুঁজে কখন আমার হাত একবার কোলে তোলে নিয়ে গালে রেখে দিলো তার; রোগা হয়ে গেছো এত চাপা পড়ে গেছ যে হারিয়ে পৃথিবীর ভিড়ে তুমি-বলে সে খিন্ন হাত ছেড়ে দিলো ধীরে।’ নারী তার চিরন্তনী মমতাময়ী রূপ নিয়ে বারে বারে উপস্থিত হয়েছে জীবনানন্দ দাশের কাব্যে। নারীই যেন তাকে উপলব্ধি করতে পেরেছে। মমতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে কবির দিকে।
নদী নারী নক্ষত্র সব মিলেই সার্থকতা পেয়েছে প্রকৃতি প্রেমিক কবির কবিতা। তার কাছে নক্ষত্র নারী, নদী, সোনার ফসল মিথ্যা নয় (সৌর করোজ্জ্বল)। কবি বলেছেন, ‘আমাকে একটি কথা দাও যা আকাশের মতো সহজ মহৎ বিশাল, গভীর-সমস্ত ক্লান্ত হতাহত গৃহবলিভূকদের রক্তে মলিন ইতিহাসের অন্তর ধুয়ে চেনা হাতের মতন আমি যাকে আবহমান কাল ভালোবেসে এসেছি সেই নারী।’ (আমাকে একটি কথা দাও) অতএব আবহমান কাল থেকেই কবি এক নারীকে ভালোবেসে এসেছেন যার জন্য সম্মানজনক স্থান রেখেছেন হৃদয়ে মনে। এটা তার স্বীকারোক্তি।
আকাশলীনায় কবি সুরঞ্জনাকে ডেকেছেন। সে আর কারো হতে পারে না। একান্তই তার। প্রেমের ব্যাপারে একেবারেই যেন আপসহীন কবি জীবনানন্দ দাশ। কোনো রাখঢাক নেই এখানে। কোনো কৌশল অবলম্বন না করে একেবারেই সহজ উক্তিতে আহবান তাঁর-সুরঞ্জনা, ওইখানে যেয়োনাকো তুমি; বোলোনাকো কথা ওই যুবকের সাথে, / ফিরে এসো সুরঞ্জনা, / ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে, / ফিরে এসো হৃদয়ে আমার, আদেশ নয়, কবি হৃদয়ের আকুতিই ব্যক্ত হয়েছে এখানে। সুজাতাকে ভালোবাসতাম আমি- এখনো কি ভালোবাসা? সেটা অবসরে ভাবনার কথা, (লোকেন যোসের জর্নাল) এখানে ভালোবাসার ব্যাপারে যে নির্লিপ্ততা দেখিয়েছেন কবি তা শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারেননি। ‘নারী যদি মৃগতৃষ্ণার মতো তবে এখনকী করে মন কারভান হবে। ‘মিতভাষণে’ কবি যে নারীকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতেই হয়- তোমার সৌন্দর্য নারী, অতীতের দানের মতন। / মধ্য সাগরের কালো তরঙ্গের থেকে / ধর্মাশোকের স্পষ্ট আহবানের মতো / আমাদের নিয়ে যায় ডেকে শান্তির / সংঘের দিকে-ধর্মে নির্বাণে; / তোমার মুখের স্নিগ্ধ প্রতিভার পানে। জীবনানন্দ দাশ লিখে গেছেন- যদিও আমার চোখে ঢের নদী ছিলো একদিন / পুনরায় আমাদের দেশে ভোর হলে, / তবুও একটি নদী রেখা যেত শুধু তারপর, / কেবল একটি নারী কুয়াশা ফুরোলে, / নদীর রেখার পার লক্ষ্য করে চলে। (স্বভাব) কবির সেই একটি নারী কে হতে পারে। কবির মুখে আরো এক নারী সম্পর্কে শুনি ‘শঙ্খমালা’ কবিতায়- কান্তারের পথ ছেড়ে সন্ধ্যার অাঁধারে / সে এক নারী এসে ডাকিল আমারে / বলিল, তোমারে চাই বেতের ফলের মতো / নীলাভ ব্যথিত তোমার দুই চোখ / খুঁজেছি নক্ষত্রে আমি কুয়াশার পাখনায় / সন্ধ্যায় নদীর জলে নামে যে আলোক / জোনাকির দেহ হতে খুঁজেছি তোমাকে সেই খানে’ এমন করে কে কবিকে খুঁজেছিল তা আমরা নিশ্চিত হতে পারি না। তবে কবি নিশ্চিত করেই বলে গেছেন এক নারীর কথা তা নিয়ে কোনো বিতর্ক থাকতে পারে না। কিংবদন্তী সেই নারীর কথা কবির মুখেই শুনি- ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে, / সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকার মালয় সাগরে / অনেক ঘুরেছি আমি, বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে / সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে; / আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন, / আমারে দুদন্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন’। এরপর আর কথা থাকতে পারে না। জীবনানন্দ দাশের কাব্যের শ্রেষ্ঠ নারী এই বনলতা সেন বলে আমরা মেনে নিতে পারি। শ্রান্ত ক্লান্ত কবি অবশেষে তরী ভিড়িয়েছেন সেখানেই। এছাড়া যেন আর কেহ নাই। কিছু নাই জীবনে তার। পরম তৃপ্তির অনুভুতিই ব্যক্ত হয়েছে তার কলমে—- সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন / সন্ধ্যা আসে, জানালার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিন, / পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পান্ডুলিপি করে আয়োজন / তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল; / সব পাখি ঘরে আসে-সব নদী-ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন; / থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’

You may also like

Leave a Comment


cheap mlb jerseyscheap nhl jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseys