পাহাড় আর নদীর কোলে এক দিন- মাজহারুল ইসলাম সাদী

by News Room

২০১৩ সালের ১৪আগস্ট। শ্রাবণের আকাশে মেঘের ঘনঘটা। সুমেশ্বরী নদীর তীর ঘেষা রাস্তা ধরে এগিয়ে চলছে আমাদের মোটর সাইকেল লক্ষ্য বাংলাদেশ-ভারত সিমান্তবর্তী পাহাড় আর নদীর মিলনস্থল অপূর্ব এক জায়গা বিজয়পুর। উদ্দেশ্য বিজয়পুরের পাহাড়, নদী, চিনা মাটির খনি, খিষ্ট্রান মিশনে ঘুরে বেড়ানো। বিজয়পুর নেত্রকোণা জেলার সু-সং দুর্গাপুর উপজেলার অন্যতম বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান। গারো পাহাড় থেকে নেমে আসা স্বচ্ছজলের দিগন্ত বিস্তৃত সুমেশ্বরী নদীর সৌন্দর্য আমাদেরকে বাধ্য করল মোটর সাইকেল থামাতে। পেছনে নদী রেখে তীরে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে নিলাম। আবার শুরু হলো যাত্রা। ঘন সবুজ গাছপালা ঘেরা অচেনা পথে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের মোটরসাইকেল। আমি মোটরসাইকেলের পেছনে বসে সংগ্রহে থাকা তথ্য উপাত্ত ঘেটে ঘেটে বিজয়পুরের দূরত্ব আর অচেনা পথের পাঠোদ্ধার করছি। দির্দেশনা দিচ্ছি ড্রাইভিংরত সফরসঙ্গীকে। অভয় দিচ্ছি পথের হারানোর সম্ভাবনা নেই। কারণ আমার তথ্য-উপাত্ত ফেল করলে বিকল্প ব্যবস্থাও আছে। দুর্গাপুর বিরিশিরিতে অবস্থিত ণডঈঅরেষ্টহাউস এর প্রজেক্ট অফিসার অমিতা সাংমার ফোন নাম্বার আমাদের সাথে আছে। প্রয়োজনে তাকে ফোন করে প্রয়োজনীয় সহযোগীতা নেয়া যাবে। যেতে যেতে দেখা হলো বিখ্যাত সাদা মাটির পাহাড়, দৃষ্টিনন্দন কুল্লাগড়া মন্দির, ঐতিহাসিক টংক আন্দোলন নেত্রী রাশিমণি স্মৃতিসৌধ। স্বভাবতই যাবার পথে আমরা খুব কম সময় ব্যয় করলাম। হঠাৎ সবুজে ঘেরা নির্জন পথে এক ঝাক পর্যটক দেখে বুঝে গেলাম। আমরা আমাদের প্রত্যাশিত স্থানের কাছাকাছি চলে এসেছি। কিছু দূর যেথেই জিরো পয়েন্টের সাইনবোর্ড আমাদের থামিয়ে দিল। সামনে যেতে নিষেধ করে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সাইনবোর্ড। পথের ধারে ক্রংকিটের বেঞ্চে বসে একটু জিরিয়ে নিলাম। সেখানে এক রাখালের নাগাল পেয়ে সেই ফাঁকে তার কাছ থেকে টুকিটাকি জেনে নিলাম। ক্ষনিকের বিশ্রাম শেষে উঠে দাঁড়ালাম। সামনে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) ক্যাম্প। ক্যাম্পের পেছনেই নদী। নদীর তীরে পাহাড়। সেই পাহাড়ে পর্যটকদের সুবিধার্তে সরকারী খরচে গড়ে তোলা হয়েছে মিনি পর্যটন স্পট। যার জন্য কোন পয়সা খরচ করতে হয় না। সবার জন্য উন্মুক্ত। বিজিবি সদস্যদের সহযোগীতা নিয়ে সিড়ি বেয়ে উঠে গেলাম সেই পাহাড়ের উপর। মুহুর্তেই এর সৌন্দর্য আমাদের বিমোহিত করল। চারপাশে সবুজের আলিঙ্গন। দূরে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে মেঘে ঢাকা গারো পাহাড়। দূর থেকে সে পাহাড়ের দৃশ্য দেখতে অন্যরকম লাগে। নিচে বয়ে গেছে সুমেশ্বরী নদী। উচুঁ পাহাড়ের একদম সোজা নিচে বিশাল নদী। সতর্কতার জন্য কাটাতারের বেড়া দেয়া হয়েছে। সেই কাটাতারে ধরে নিচে তাকিয়ে অন্যরকম এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি হলো। ছবি তুলছি। তবু কান্তি নেই। কখনো নদীর। কখনো দূরের গারো পাহাড়ের। গারো পাহাড়ের উপর অসম্ভব সুন্দর ঝাপসা মেঘের উড়ে বেড়ানোর ছবি তুলতে গিয়ে হাতের ১৪ মেগা পিক্সেলের ক্যামেরাটাকে তুচ্ছ মনে হলো। আফসোস হলো একটা এসএলআর থাকলে ঐ মেঘের ভেসে বেড়ানো মুঠোবন্দী করতে পারতাম। পর্যটকদের সংখ্যা বেড়ে গেলে নেমে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। বৃদ্ধ ঝালমুড়িওয়ালার কাছ থেকে ঝালমুড়ি খেতে খেতে নেমে এলাম নিচে। বিজিবি ক্যাম্পের টিউবওয়েলের পানি আর এক বিজিবি জওয়ানের আতিথেয়তায় ক্যাম্পের গাছের তাজা পেয়ারা খেয়ে কান্তি মুছে গেল। মোটরসাইকেল রেখে পায়ে হেঁটে আশপাশের ঘুরে দেখলাম। ঘুরতে ঘুরতে পরিচয় হলো ঢাকার সাভার থেকে বেড়াতে যাওয়া একটি পরিবারের সাথে। সফরসঙ্গী মোটর সাইকেল নিয়ে আসলে ক্ষনিকের সখ্যতা গড়ে উঠা পরিচিতদের পেছনে ফেলে আমরা সামনে এগিয়ে গেলাম। ঐ রাখালের কাছ থেকে শোনেছিলাম আশ-পাশে কোন এক পাহাড়ে কমলার বাগান আছে। ইচ্ছে ছিল সেখানে যাওয়ার। পথঘাটের দিশা করতে না পেরে সে সিদ্ধান্ত বাদ দিলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম এখানকার খ্রিষ্টান মিশনে যাব। মিশন পরিচালিত স্কুল ফেরত ছাত্র-ছাত্রীদের জিজ্ঞেস করে করে পাহাড়ের সরুপথে পৌছে গেলাম রানীখংয়ে পাহাড়ের উপর অবস্থিত সেন্ট যোসেফের ধর্ম পল্লীতে। স্থানীয়দের কাছে রাণীখং মিশন নামে যার পরিচিতি। গিয়ে দেখলাম মিশনের পাশে পাহাড়ের নিচে বিশাল দিঘীতে মাছ ধরছেন মিশনে কর্মরত বিদেশী নান আর যাজকেরা। তাদের পাশ কাটিয়ে আমরা উঠে গেলাম পাহাড়ের উপর মিশনে। বিশাল মিশন সুন্দর ভাবে সাজানো। এক পাশে নদীর পার ঘেষে স্কুল। স্কুলের হই-হুল্লোড় থেকে বাঁচতে বেশ দূরত্ব রেখে তৈরী করা হয়েছে ডিস্পেন্সারী। পুরো মিশনের স্থানে স্থানে অপূর্ব সুন্দর নানান জাতের ফুল গাছ। এক স্থানে যিশুখ্রিষ্টের বিশাল মুর্তি। অপর এক স্থানে বিশাল ক্রুসের সামনে বাইবেল পাঠরত ও প্রার্থনারত ছয় কিশোরের ভাস্কর্য। পাহাড় কেটে আরো উপরের দিকে যাজকদের প্রার্থনাঘর ও বাসস্থান। সে দিকে জনসাধারণের প্রবেশ সংরক্ষিত। দেখা এবং ছবি তোলা শেষে ফিরে আসার পথে মাছধরা শেষে ফিরে আসা যাজক ও নানদের সাথে সিড়িতে দেখা হলো। আমি ভাবলাম একটু আলাপ করি। আবার ভাবলাম এরাতো বিদেশী। পরে চিন্তা করলাম মিশনে যারা থাকে তারা বাংলা জানে এবং এরা অত্যান্ত বিনয়ী হয়। আমি এগিয়ে গেলাম। এবং সম্বোধন করলাম। তাদের মাঝ থেকে দায়িত্বশীল গোছের মাঝ বয়েসী এক মহিলা আমার ধারণাকে সত্য করে দিয়ে আমার সাথে কথা বললেন এবং কোশল বিনিময় করলেন। সেখান থেকে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের লক্ষ্য এবার সোমেশ্বরীর অপরপার। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় পেরহলাম সোমেশ্বরী নদী। নদীতে খুব কাছ থেকে দেখলাম কিভাবে ঠেলাজাল দিয়ে মাছ ধরার মতো করে অথবা নদীর মাঝে ভেসে উঠা চরে গর্ত করে অসংখ্য লোকজন কয়লা তুলছে। এতদিন শোনতাম কয়লা খনিতে পাওয়া যায় তখন দেখলাম কয়লা নদীতেও পাওয়া যায়। না দেখলে বিশ্বাস হবে না। নদী পেরিয়ে দূর্গাপুর উপজেলা সদর। সেখান থেকে চলে গেলাম এপারের আরেক সীমানায় পাহাড় দেখতে নলুয়াপাড়া সীমান্তে। সেখানে ভারত সীমান্তে অনুপ্রবেশ, পাহাড়ের গারো বাড়ীতে ঘোরে বেড়ানো ও তাদের আতিথেয়তার গল্প অন্য কোন একদিন হবে। দূর্গার বাজারে যখন ফিরলাম তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। হালকা বৃষ্টি হচ্ছে। আমার মনে পড়ল নেত্রকোণার বিখ্যাত বালিশাই মিষ্টির কথা। সাইজে বড় হওয়ায় কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ যার নাম দিয়েছিলেন বালিশ মিষ্টি। বৃষ্টির মধ্যেও অনেক খোঁজলাম কিন্তু সেই মিষ্টি আর পেলাম না। অত্যান্ত সুন্দর একটি দিন কাটল। আফসোস বলতে শুধু থাকল বালিশাই মিষ্টি না পাওয়া আর সময় স্বল্পতায় দেশের একমাত্র কালচারাল একাডেমী দুর্গারের উপজাতীয় সংস্কৃতিকেন্দ্রে ঘুরতে যাওয়ার সাধ পূরণ না হওয়া।

You may also like

Leave a Comment


cheap mlb jerseyscheap nhl jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseys