নেলসন ম্যাণ্ডেলার রাজনৈতিক দর্শন ও বাংলাদেশের বিভক্তির রাজনীতি

by News Room

গোলজার আহমদ হেলাল:
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রয়াত প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যা-েলা অনাগত ভবিষ্যতে সত্য, ন্যায়, ঐক্য, সহমর্মিতা ও সহাবস্থানের প্রতীক হিসেবে বেঁচে থাকবেন বিশ্ববাসীর কাছে। নির্যাতিত, নিপীড়িত, বঞ্চিত ও অধিকারহারা মানুষের জন্য নিবেদিত এ মহাপুরুষ বিশ্ববাসীর সামনে এক  জ্বলন্ত সাক্ষী হয়ে থাকবেন যুগ যুগ ধরে।
দীর্ঘ ২৮ বছর পর বন্দী জীবন থেকে মুক্তি লাভ করে বর্ণবাদের যাতাকালে শতাব্দী ধরে নিস্পেষিত একটি জাতিকে তিনি সহমর্মী ও সহাবস্থানে উদ্বুদ্ধ করেছেন। দীর্ঘ আন্দোলনের সাফল্যের পর তিনি যে বর্ণবাদ মুক্ত রাষ্টের প্রধান হয়েছিলেন, সে সরকারের দ্বিতিয় ব্যক্তি করে নিয়েছিলেন আগের সরকারের প্রেসিডেন্টকে, যারা তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করেছিল। এক মেয়াদে দেশটির নেতৃত্ব দেয়ার পর ম্যা-েলা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। এই মহত্ব তাকে শুধু নিজ দেশের জনগণের মধ্যেই নয় সারা দুনিয়ায় অনুকরণীয় করে রেখেছে। তিনি নিজেকে আজীবন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করতে পারতেন, তিনি সে পথে যাননি। কালোদের নিপীড়নকারী শ্বেতাঙ্গদের দেশছাড়া করে প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু, সেটি করলে আজকে এতো নন্দিত তিনি হতেন না। ম্যা-েলা যখন বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন করেছিলেন তখন খোদ আমেরিকা তাকে ও তার দলকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়েছিল। এবং তৎকালীন আফ্রিকান শাসককে তারা সৈণ্য দিয়ে সহায়তাও করেছিল। অথচ আজ ম্যা-েলার অমর কীর্তির কারণে মার্কিণ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন আমি ম্যা-েলার রাজনীতির অনুসারী।
বলার অপেক্ষা রাখে না ম্যা-েলার সহমর্মিতা ও সহাবস্থানের ঐ রাস্তায় যেতে পারেনি কঙ্গো, সিয়েরালিওন, আইভরিকোষ্ট, সোমালিয়া সেসব দেশেরই নাম। এ তালিকায় একসময় লেবাননও ছিল। এখন যুক্ত হচ্ছে সিরিয়া ও আফগানিস্তান। আর এই সারিতে নতুন যুক্ত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আমাদের দেশে রাজনৈতিক বিভেদ ছিল, তা হানাহানিও তৈরী করেছে বিভিন্ন সময়। কিন্তু এখন যে প্রতিহিংসার আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে তা সহজে নিভে যাওয়ার মতো নয়। জাতিকে বিভক্তির যে দেয়াল ক্রমে ক্রমেই উচ্চকিত করা হচ্ছে, ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাইকে রক্ত ঝরানো হত্যাকা-ের উসকানী কারা দিচ্ছে? তা ভেবে দেখা দরকার।
১২ ডিসেম্বর’১৩ রাত ১০.০১ মিনিটে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসী দেয়া হয়। আসলে আব্দুল কাদের মোল্লার মামলা একটি ভূয়া মামলা। এই মামলার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। সংবিধানের ৪৭(৩) অনুচ্ছেদে গণহত্যাজণিত অপরাধ বা মানবতা বিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধের দায়ে যে ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হবে সে ধরনের ব্যক্তির কোনো ক্রাইটেরিয়ায় তিনি পড়েন না। উপরন্তু মীরপুরের যে কসাই কাদেরের দায়ভার আব্দুল কাদের মোল্লার উপর চাপিয়ে দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে, সে কসাই কাদের ৭১ সালেই মারা গিয়েছে। মৃত এক ব্যক্তির অপরাধের দায়ভার তার উপর চাপিয়ে দিয়ে বিশ্ববাসীর সামনে বাঙ্গালী জাতিকে অপমাণিত করা হয়েছে। আমাদের বিজ্ঞজনেরা এটাই প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন যে, আব্দুল কাদের মোল্লা ও কসাই কাদের এক নয়। মুক্তিযোদ্ধা জাদুঘরে রক্ষিত মোমেনা বেগম আর ট্রাইব্যুনালের মোমেনা বেগম এক নয়। তাই বিশ্ব সম্প্রদায় আঁচ করতে পেরে কাদের মোল্লার ফাঁসী স্থগিত করতে আহ্বান জানায় বাংলাদেশকে। মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাতিসংঘ, ইইউ, তুরস্ক প্রভূতি দেশসহ বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ আহ্বান জানায়। পাশাপাশি তারা বলেন, রায় কার্যকর করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদ- পূরণের প্রক্রিয়া অনুসরণ অত্যাবশ্যক। নতুবা বাংলাদেশের পরিবেশ বিঘিœত হবে। সবকিছু উপেক্ষা করে বাংলাদেশ এগিয়ে গেল বিচার বিভাগীয় হত্যাকা-ের দিকে। ফলে আমাদের জাতির মধ্যে আবারো শতাব্দীর পর শতাব্দীকাল পর্যন্ত একটি বিভেদ ও প্রতিহিংসার জন্ম নিল।
ব্যক্তি ম্যা-েলা আজ লোকান্তরিত। কিন্তু ম্যা-েলার আদর্শ চিরদিন প্রেরণা হয়ে থাকবে। ম্যা-েলার এই আদর্শ ছিল বিভক্ত জাতিকে এক করার। ঐক্যবদ্ধ জাতিকে বিভক্ত নয়। আমরা আজ ম্যা-েলার কাছ থেকে শিক্ষা নিতে পারি। গড়ে তুলতে পারি ঐক্যবদ্ধ দেশ। ভেঙ্গে ফেলতে পারি বিভক্তি নামক দেয়াল।

লেখকঃ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট

You may also like

Leave a Comment


cheap mlb jerseyscheap nhl jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseys