গাজায় ছয় ফিলিস্তিনি যোদ্ধাকে হত্যার এক মর্মস্পর্শী কাহিনী

by News Room

সিলেটের খবর ডেস্ক: সাম্প্রতিক গাজা যুদ্ধে ফিলিস্তিনের ছয় ইসলামী যোদ্ধাকে আটক করে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করেছে ইসরাইলি সেনারা। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে মার্কিন সংবাদপত্র ডেইলি বিস্ট এ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে। এটাকে স্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ বলছে ডেইলি বিস্ট। ডেইলি বিস্ট জানায়, জুলাইয়ের শেষের দিকে যখন গাজার খুজা এলাকায় ভয়ানক সংঘর্ষ চলছিল তখন গাজার খুজা এলাকায় ছয় ইসলামিক জিহাদির হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সরকারি তদন্ত কার্য স্থগিত হয়ে গেলে তারা ঐ ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের স্পষ্টত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সবিস্তারে ফাঁস করে দেয়।  দ্য ডেইল বিস্টের প্রতিবেদনের পর এক মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এ হত্যাকাণ্ড তদন্তে ইসরাইলি সরকার এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেয়নি।  বরং বারবার তদন্তের তাগাদা দিলেও ইসরাইলি সরকার তাতে সাড়া দিতে প্রায় অস্বীকার করেছে।

উপরন্তু স্বাধীন মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালকে গাজা পরিদর্শন করতে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বাধা দেওয়া হয়েছে। এ মানবাধিকার সংগঠন দুটোও সরেজমিনে ঘটনার তদন্ত করতে সক্ষম হয়নি। আর জাতিসংঘের তদন্ত সবেমাত্র শুরু হয়েছে।

তবে যাই হোক, দ্য ডেইলি বিস্ট পত্রিকা এ ঘটনায় তার নিজস্ব তদন্ত চালিয়ে গেছে।

অন্যদিকে কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ঘটনাটিকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করছে। এ সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে নিহত লোকগুলো, যারা একটি বিধ্বস্ত বাড়ির গোসলখানার মধ্যে পড়ে ছিল, নিছক নির্দোষ পথচারী। মূলত তারা ছিল ইসলামিক জিহাদের কঠোর গেরিলা যোদ্ধা, যারা ইসরাইলি সেনাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য টানেলের অভ্যন্তরে লুকিয়ে ছিল।

ইসরাইলিদেরকে প্রতিরোধ করতে এক পর্যায়ে তারা টানেল থেকে বের হলে তাদেরকে ধরে ফেলে ইসরাইলি সেনারা। এরপর একটি বিধ্বস্ত বাড়ির গোসলখানার পাশে নিয়ে গিয়ে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়। তদন্তে এ ঘটনা সত্য বলে প্রমাণিত হলে এটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে পরিগণিত হবে।

ডেইলি বিস্টের প্রতিবেদকের ভাষায় শুনুন বাকিটা- বারবার চেষ্টা করার পর শেষ পর্যন্ত ইসলামিক জিহাদের একজন সদস্যের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হই আমি যিনি আমাকে জানান যে তিনি খুজার যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং তিনি তার নিজের সংগঠনের প্রেক্ষিত থেকে যেটা ঘটেছিল তার বিস্তারিত বর্ণনা উপস্থাপন করেছিলেন।

আমরা গাজার একটি হোটেলে অ্যারাবিক কফি খেতে খেতে কথা বলছিলাম। একটু অপ্রতিভ ২০ বছরের ছেলেটি আমার কাছে নিজেকে আবু মুহাম্মদ বলে পরিচয় দিলেন। কফিতে চুমুক দিতে দিতে যুদ্ধের সেই ভয়ঙ্কর ২৩ দিন সম্পর্কে এবং ধরা পড়া ও নিহত হওয়ার আগে ছয়জন যোদ্ধার সাথে তার শেষ রেডিও যোগাযোগের কথা বলেন।

আবু মুহাম্মদ জানান, ১৬ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত সে এবং অন্যরা খুজা এলাকার বেশ কয়েকটি টানেলের নিচে লুকিয়ে ছিল। তার বর্ণনা মতে, এ টানেলগুলো অন্যান্য মাটির নিচের পথের সাথে যুক্ত ছিল যে পথগুলো গাজাকে উত্তর থেকে দক্ষিণে সংযুক্ত করেছে।

সে বলতে থাকে যে এ টানেলগুলোকে ইসরাইল তাদের প্রধান লক্ষ্য করে। কিন্তু যুদ্ধকালে তারা এর কিয়দংশই ধ্বংস করতে পেরেছিল।

আবু মুহাম্মদ মাঝে মাঝে দূরের পানে চেয়ে এবং স্পষ্টত কেঁপে কেঁপে উঠে বলতে থাকে যে সে এবং অন্যরা ইসরাইল যে দিন স্থল অভিযান শুরু করে তার আগের দিন  গাজা ও ইসরাইল সীমান্তের ডানে অবস্থিত খুজা এলাকায় উপস্থিত হয়। আবু মুহাম্মদ জানান, শুরুতে ইসলামিক জিহাদের যোদ্ধারা হামাসের আল-কাসসামের ব্রিগেডের সাথে যোগ দেয় এবং পপুলার রেজিস্ট্যান্স কমিটি নামে সীমান্ত বরাবর ইসরাইলি সেনাদের উপর পাল্টা হামলা হিসেবে ভয়ানকভাবে মর্টার ও রকেট ছুঁড়তে থাকে।

আবু মুহাম্মদের মতে, ইসরাইলি সেনাদের স্থল আক্রমণ যখনই তাদের কাছাকাছি চলে আসল, তখন তীব্র এক ইসরাইলি আক্রমণ শুরু হলো। এ আক্রমণে ইসরাইলি বাহিনী এফ-১৬ থেকে বোমা বর্ষণ ও আর্টিলারি থেকে গুলি বর্ষণ করে অনেক যোদ্ধাকে হত্যা করে। বোমা বর্ষণ আরো তীব্রতর হলে বেসামরিক লোকজন পালাতে শুরু করে।  কিন্তু আসল বিপদ শুরু হয় তখন যখন ইসরাইলিরা ট্যাংক নিয়ে বেসামরিক লোকদের ওপর নিধনযজ্ঞ চালাতে শুরু করে।

যুদ্ধের এ পর্যায়ে ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা পিছু হটে এবং সুযোগের অপেক্ষা করতে থাকে আর এদিকে ইসরাইলি সেনারা বোমা বর্ষণ এবং বিমান হামলা চালিয়ে খুজা এলাকার একটার পর একটা ভবন সমানে গুড়িয়ে দিতে দিতে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে।

ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা টানেলের নিচে থেকে শুনতে থাকে যে ইসরাইলি সেনারা  ট্যাংক আর জিপ নিয়ে গাজা ভূ-খণ্ডের প্রায় ৪৪ ভাগ এলাকা নিয়ে গড়ে উঠা বাফার জোনের মধ্য দিয়ে সবকিছু মাটির সাথে গুড়িয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে।

আবু মুহাম্মদ জানান, তারা প্রায় এক সপ্তাহ টানেলের মধ্যে ছিল। টানেলের মধ্য থেকে তারা ইসরাইলিদের উদ্দেশ্যে মর্টার নিক্ষেপ করত। ইসরাইলিরা প্রায় ৬০ টি ট্যাংক নিয়ে খুজা এলাকায় আক্রমণ চালায়।

আবু মুহাম্মদের মতে, ইসরাইল যখন খুজা এলাকায় তাদের সেনাবাহিনী মোতায়েন করে শুধুমাত্র তখনই ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা তাদের আক্রমণ শুরু করে।

আবু মুহাম্মদ বলেন, প্রথমে আমরা ট্যাংক আর জিপগুলো লক্ষ্য করে আক্রমণ শুরু করি।

ইসরাইলি বাহিনীকে প্রতিরোধের দ্বিতীয় ধাপের প্রচেষ্টায় ফিলিস্তিনের গেরিলা বাহিনীর ৩টি অংশ সব দিক থেকে ব্যাপক আক্রমণ চালায়।

তিনি বলেন, ‘আমাদের কিছু লোক মাটির মধ্য থেকে বেরিয়ে আসত। তারা হঠাৎ সেনাদের উপর আক্রমণ করে আবার টানেলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যেত। বাকি যোদ্ধারা কোন খালি বাড়ি থেকে গুলি চালাত। এতে সেনারা দিশেহারা হয়ে যেত। মূলত গেরিলা বাহিনী টানেলের প্রবেশমুখ থেকে সর্বাত্মক যুদ্ধ চালিয়ে যায়’।

আবু মুহাম্মদ বলেন, এমনই এক ভয়ানক আক্রমণে ইসরাইলি সেনাদের দখল করা একটি বাড়িতে আঘাত হানতে যোদ্ধারা ‘শোল্ডার ফায়ারড রকেট’ ব্যবহার করেছিল। এ আক্রমণ থেকে পালাতে গিয়ে দুজন ইসরাইলি সেনা স্নাইপারের গুলিতে নিহত হয়।

যুদ্ধে ঠিক কত লোক নিহত হয় তার সঠিক সংখ্যা সে হিসাব করতে পারেনি। কিন্তু তিনি জানান, তাদের পক্ষের আনুমানিক ১৩০ জন যোদ্ধা নিহত হয় যেটা ইসরাইলিরা ১৮০ জন বলে প্রচার করে। ডেইলি বিস্টের প্রতিবেদক বলেন, যুদ্ধের মধ্যে এবং যুদ্ধের পরে আমি মোট চারবার  খুজা এলাকা দেখতে গিয়েছি।  সেখানে শহরের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে তীব্র যুদ্ধের চিহ্ন দেখেছি। একদিকে ইসরাইলি সেনারা বাড়ি আর অ্যাপার্টমেন্ট লক্ষ্য করে মেশিনগান থেকে গুলি ছুঁড়েছে। অন্যদিকে যোদ্ধারা পাল্টা মর্টার ও রকেট ছুঁড়েছে, সবকিছুতে যার চিহ্ন রয়ে গেছে। বসতি এলাকার প্রবেশ পথে ইসরাইলি বাহিনীর বুলেটের খোসা পুরু হয়ে পড়ে আছে।

যে দিন তার সহযোদ্ধাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয় সেই তারিখটির কথা বলতে পারলেন না আবু মুহাম্মদ কিন্তু সেনাদের হাতে তাদের ধরা পড়ার ঘটনা এবং তাদের জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোর কথা যেগুলো সে তার ওয়াকিটকিতে শুনেছিল তার সবকিছু সবিস্তারে স্মরণ করলেন।

যখন ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন তখন তিনি টেবিলের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলেন, আস্তে আস্তে বলছিলেন কিভাবে ছয় যোদ্ধা শহরের একটি ধ্বংস হয়ে যাওয়া মসজিদ এবং জলাধার সংলগ্ন টানেলের মুখ থেকে বের হলো।

তিনি বলছিলেন, যোদ্ধাদের ইচ্ছা ছিল সেনাদের উপর একটি সংক্ষিপ্ত ও অতর্কিত আকমণ চালানো। তবে ঐ মুহূর্তে ইসরাইলি সেনারাই আমাদের জন্য বিস্ময়কর কিছু নিয়ে প্রস্তুত ছিল। গেরিলারা টানেল থেকে বের হওয়া মাত্রই টানেলের প্রবেশমুখে ইসরাইলি সেনাদের আক্রমণের মুখে পড়ল।

যখন যোদ্ধারা পিছু হটে সে বাড়ির দিকে চলে গেল তারা একটি বার্তা পাঠাল যে আমাদের একজন যোদ্ধা আহত হয়েছে আর তাদের গোলাবরুদ শেষ হয়ে যাওয়ার পথে। এরপর তারা ঐ অসমাপ্ত দোতলা বাড়ির মধ্যে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ল।

কিছুক্ষণ পরই আবু মুহাম্মদ রেডিওতে ব্রাশ ফায়ারের আওয়াজ শুনতে পেলেন।

আবু মুহাম্মদ বলেন যে গোলাগুলি চলাকালে যখন যোদ্ধাদের গোলাবারুদ শেষ হয়ে যায় তখন তিনি বাড়ির ওপরে ইসরাইলি ড্রোন থেকে গুলি ছোড়ার শব্দ শুনতে পান।

আবু মুহাম্মদ যা তার রেডিও যোগাযোগে শুনেছিলেন এবং প্রত্যক্ষদর্শী যোদ্ধাদের কাছ শুনেছিল তা বর্ণনা করে বলেন যে, যোদ্ধাদের গোলাবারুদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরপরই ইসরাইলি সেনারা যোদ্ধাদেরকে ঘিরে ফেলে এবং বাড়ির প্রবেশ পথে তাদেরকে ধরে ফেলে। এরপর বাড়ির ভিতরে একটি গোসলখানার পাশে তাদেরকে গুলি করে হত্যা করে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে আবু মুহাম্মদ জানান, হত্যার আগে সেনারা যোদ্ধাদের সব অস্ত্রশস্ত্র সরিয়ে নেয়। তারপর এম-১৬ এর একটা লম্বা বিস্ফোরণ এবং এরপর সব নীরব।

বিস্টের প্রতিবেদব বলেন, খুজা এলাকায় আমার প্রথম পরিদর্শনের সময় আমি গোসলখানার এক পাশে পড়ে থাকা দুটো গোলাবারুদের ভেস্ট পেয়েছিলাম যেখানে ঐ ছয় জন যোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছিল। পচে যাওয়া লাশগুলো কালো প্যান্ট  ও বেল্ট পরিহিত ছিল। তাদেরকে যখন বয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন পচা মাংস থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল আর তাদের ফুলে ওঠা শরীর দেখে তাদেরকে চেনার উপায় ছিল না।

আবু মুহাম্মদ জানান, তাদের পরিবারের কাছে খবর পৌঁছে দেওয়া হয়েছে কিন্তু ইসলামিক জিহাদ তাদের মৃত যোদ্ধাদের নাম এখনো পর্যন্ত গোপন রেখেছে।

যখন ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ এ বিশেষ ঘটনাটি তদন্ত করতে অস্বীকার করেছে, যেটা যুদ্ধাপরাধ বলে বিবেচিত হতে পারে, তখন ইসরাইলি গোয়েন্দার একটি সূত্র গত সপ্তাহে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এবং অন্যান্য গণমাধ্যমের কাছে সরবরাহ করেছে।

ইসরাইলিদের হিসেবে গাজা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মোট ইসলামি যোদ্ধাদের সংখ্যা ৫,২০০ যেখানে হামাসের দাবি এ সংখ্যা প্রায় ১৬ হাজার।

এ বছর গাজার যুদ্ধ ৫০ দিন স্থায়ী হয়। আর এ যুদ্ধ বাধে মূলত পশ্চিম তীরে ইসরাইলের গণপ্রেপ্তার ও তল্লাশি অভিযানের কারণে- ইসলামিক জিহাদ আর হামাসের রকেট যার জবাব দেয়। গাজার এ যুদ্ধ ইসরাইলের জন্য অস্বস্তিকর এক যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে শেষ হয় যে যুদ্ধে ইসরাইলের ছয় বেসামরিক লোক ও ৬৬ ইসরাইলি সেনা নিহত হয়। অপর দিকে ফিলিস্তিনের মৃতের সংখ্যা এমনকি ইসরাইলের রক্ষণশীল হিসেবেও ২ হাজার ১২৭ জন।

ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থার দাবি নিহতদের মধ্যে ৩৪১ জন হামাসের সদস্য, ১৮২ জন ইসলামিক জিহাদের এবং ৯৩ জন অন্যান্য দলের। এছাড়া ৭০৬ জন নিছক বেসামরিক লোক যাদের মধ্যে ২৫৩ জন নারী ও ৪৯৫ জন শিশু।

গাজায় ইসরাইলের ৫০ দিনের যুদ্ধের কুয়াশা সবেমাত্র পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। এবং যদিও খুজার যুদ্ধের অনেক ঘটনাই এখনো রহস্যাবৃত হয়ে আছে, ঐ সমস্ত ঘটনার প্রমাণাদি যতই প্রকাশ পাবে, পরিস্থিতি ততই ভয়ঙ্কর হবে। ভাষান্তর: জামির হোসেন

You may also like

Leave a Comment


cheap mlb jerseyscheap nhl jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseys