কেমুসাসে কর্তৃত্বের সংঘাত এবং একজন সাধারণ লেখকের কৈফিয়ত

by News Room

সৈয়দ মবনু: সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ আমার দ্বিতীয় বাড়ি। হয়তো এদাবী আরো অনেক লেখক-সাহিত্যিকদের। আমার একথার সাথে যাদের দ্বি-মত, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রইল। এই সংসদে আমি আসা শুরু করি মায়ের পেটে বসে কিংবা বাবার মগজে থাকতে। আর যখন আমি খুব ছোট ছিলাম, একেবারে ক্লাস টু-ত্রীতে, তখন থেকে নিজ পায়ে আসা শুরু। এই প্রতিষ্ঠানের প্রাণপুরুষ মুহম্মদ নুরুল হক খুব ¯স্নেহ করতেন। তাঁর ¯স্নেহ থেকেই আসা-যাওয়া। আস্তে আস্তে নিজে লেখালেখি শুরু করি। এক সময় সংসদের প্রতি প্রেম হয়ে যায়। অতঃপর জীবন সদস্য হই। আমার জীবন সদস্য নম্বার-৩৫০। এক পর্যায়ে কমিটির সদস্য হই। এ পর্যন্ত সবশেষ ২০১৩-২০১৪-এর কমিটিতে আমি সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক হিসেবে বিনাপ্রতিন্দ্বীতায় নির্বাচিত হই। কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের ইতিহাসে সরাসরি ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচন এ ছিল প্রথম। মহান আল্লাহর শোকর আদায় করি তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীতা ছাড়া যে আমাকে উত্তির্ণ করেছিলেন।

কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদকের প্রধান কাজ হলো সাপ্তাহিক সাহিত্য আসর পরিচালনা আর সাহিত্য পত্রিকা ‘আল-ইসলাহ’ প্রকাশ। আলহামদুলিল্লাহ এ দুই দায়িত্বই আমি আমার সাধ্যমতে আদায়ের চেষ্টা করেছি। দায়িত্ব আদায়ের সফলতা-ব্যর্থতার বিচার-বিবেচনা আগামী প্রজন্মের হাতে। আমার দায়িত্ব লাভের পূর্বের সাহিত্য আসরগুলোর উপস্থিতি আর আমার দায়িত্ব লাভের পরের উপস্থিতি এবং অনুষ্ঠানের আলোচকদের তালিকা দেখে যে কেউ বিচার করতে পারেন এক্ষেত্রে সফলতা এবং ব্যর্থতা। এসবই খাতায় কিংবা বিগত দিনের আল-ইসলাহে লিপিবদ্ধ আছে। আর আল-ইসলার কথা কি বলবো? আল-ইসলাহও একটা ডকুমেন্টারী বিষয়। যেকোন মানুষ বিগত ৮২ বছরের সবগুলো আল-ইসলাহ হাতে নিয়ে বিচার করতে পারেন, ভালো না খারাপ হয়েছে।

আমি একথাগুলো বলছি না এজন্য যে কেউ আমাকে বাহঃ বাহঃ বলুক। আমি কোনদিনই বাহঃ বাহঃ পাওয়ার জন্য কাজ করি না। আমি কোনদিনই নিজের প্রসংশা শোনার জন্য সম্বর্ধনা সভার আয়োজন করি না। বরং যারা করেন তাদেরকে পছন্দ করি না। আমি আমাকে শুধু একজন লেখক ছাড়া অন্যকিছু কোনদিন মনে করিনি। আমার বিশ্বাস, একজন লেখক মানে সমাজের শিক্ষক। প্রায় সময় বলেও থাকি- আমি সমাজের একজন অবৈতনিক শিক্ষক। কেউ আমাকে মানলে যা, না মানলেও তা। সবসময় আমি এই শিক্ষকের দায়িত্ব পূর্ণাঙ্গরূপে আদায়ের চেষ্টা করি। আমার এই আদায় হয়তো সবসময় ত্রুটিমুক্ত নয়, তবে নিজের মনকে পরিশুদ্ধ রাখতে আমি সর্বদা চেষ্টা করেছি। আমি নিজের কর্ম সম্পর্কে এখানে কিছুই বলতে চাই না। লেখালেখি করি আমি সেই শৈশব থেকেই। আর লেখা প্রকাশ হওয়া শুরু হয়েছে যতটুকু সম্ভব ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দ থেকে, তখন আমার বয়স দশ। ইতোমধ্যে ত্রিশের অধিক বই প্রকাশিত। আমি কোনদিনও কাউকে গিয়ে বলিনি আমার লেখা বা গ্রন্থের উপর আলোচনা লিখতে কিংবা আমার একটা বই পড়তে। আমি মূলত লেখালেখি করি নিজের অবস্থা বুঝার জন্য। নোট করে পড়লে যেকোন বিষয় ভাল করে বুঝা যায়, এই চিন্তা থেকেই আমার বেশির ভাগ প্রবন্ধ লেখা। আর গান-কবিতা আমার আত্মার অনুবাদ। আমার খুব লজ্জা হয় কোন মানুষ যখন সংবর্ধনা সভার আয়োজন করে। মানুষ এতো নির্লজ্জ হয় কেমনে আমার বুঝতে কষ্ঠ হয়। একেবারে যৌবনের শুরুতে আমি একটা সংবর্ধনা পেয়েছিলাম। সেই সংবর্ধনার লজ্জায় আমি এখনও স্তব্ধ হয়ে যাই। আর যারা নিজের টাকা খরচ করে সংবর্ধনা নেয় ওরা তো বিশ্ব বেহায়া এবং অত্যন্ত নির্লজ্জ। ওদের প্রতি মন থেকে প্রচুর ঘৃণা। এখন আমার সংবর্ধনা তো দুরের কথা, আমি আমার জানাজায়ও খুববেশি হৈ চৈ আশা করি না। তিনজনই আমার জানাজায় যথেষ্ট। যারা আমাকে ভালবাসেন না তারা জানাজায় এসে কষ্ট করার প্রয়োজন নেই। আমি মনে করি যারা আমায় ভালবাসেন না তারা আমার জানাজার সময় এসে সময় নষ্ট না করে তখন নিজের জন্য কিছু করলে বেশি উপকার হবে। আমি প্রেমিক মানুষ, শুধু প্রেমিকদেরকে দেখতে ভালবাসি। যাক, এ সব বলতে আমি আজ লিখতে বসিনি। আজকের লেখার প্রসঙ্গ-কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদে কর্তৃত্বের সংঘাত।

গত ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে ছিল কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের ২০১৫-২০১৬ খ্রিস্টাব্দের কর্তা নির্বাচনের তারিখ। মোট তেইশটি পদের জন্য এখানে এখানে দুটি প্যানেল এবং কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছিলেন। ২৭ তারিখ দুপুর পর্যন্ত সেখানে নির্বাচনের কার্যক্রম চলছিল। আমি সকাল থেকেই সংসদে। নিজেও দুপুর ১২টার দিকে ভোট দিয়েছি। দুপুর ২টায় বাসায় আসি ছেলে-মেয়েকে ভোটের জন্য নিয়ে যেতে। আমি যখন বাসা থেকে বের হবো তখন ফায়যুর রহমান ফোন দিয়ে জানায়- কেমুসাসে মারামারি হয়েছে। সাথে সাথে আমি সংসদের সাধারণ সম্পাদক আবদুল হামিদ মানিককে ফোন দিয়ে বিষয়টির সত্যতা জানি। তিনি সত্যতা স্বীকার করলে তাঁকে জিজ্ঞাস করি ছেলে-মেয়েকে ভোটের জন্য নিয়ে আসব কি না? তিনি না করলে আমি তাদেরকে রেখে খুব দ্রুত একটি সিএনজি নিয়ে কেমুসাসে যাই। তখন আমার সাথে ছিল সংসদের জীবন সদস্য আসিফ আজহার শিপু। সেখানে গিয়ে দেখি প্রচুর মানুষ কেমুসাসের সামনে সমবেত। সবাই বিষয়টি নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করছেন। কিন্তু কে বা কারা করেছে তা কেউ বলতে পারছেন না বা জানলেও কেউ বলতে চাচ্ছেন না। সংসদের সামনের গ্লাস ভাঙ্গা। কষ্ট হয়। খুব কষ্ট। এই কষ্ট কোনদিন শেষ হবে না। তবে এই কষ্টের পাশাপাশি কিছু প্রশ্ন আসতে থাকে মনে-

১) কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদকে যারা আক্রান্ত করেছে তাদের পরিচয় কি এবং তারা কেন আক্রান্ত করলো?
২) এই ঘটনার জন্য দায়ী কি শুধু তারা যারা আক্রমণ করেছে, না বর্তমানে যারা নিয়ন্ত্রণ করছেন তারাও অনেকাংশে দায়ী?
৩) এই ঘটনার সূত্রপাত কি এদিনই হয়েছে- না এর কোন পূর্বসূত্র রয়েছে, থাকলে সূত্রগুলো কি কি?
৪) এই সংসদ আক্রান্ত হওয়ায় আমার কেন কষ্ট লাগছে?
৫) আমাদের পক্ষে কি সম্ভব এই আক্রমণকারীদেরকে খুঁজে বের করে শাস্তি নিশ্চিত করা?
৫) এই সাহিত্য সংসদের সাথে আমার সম্পর্ক কি এবং বাকী ১৭শ জীবন সদস্যের সম্পর্ক কি?
৬) কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ কি কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠি বা দলের প্রতিষ্ঠান?
৭) সাহিত্য সংসদের নির্বাচনে ডান, বাম, ইসলামিক সবার দলীয় প্রভাব বিস্তারের এত চেষ্টা কেন?
৮) লেখক-সাহিত্যিকদের প্রতিষ্ঠান বলে খ্যাত এই সংসদের কমিটি গঠনে বা নির্বাচনে লেখক-সাহিত্যিকেরা কতটুকু গুরুত্ব পাচ্ছেন?
৯) প্রতি দু বছর পরপর যে কমিটি গঠন বা কমিটি গঠনের জন্য নির্বাচন হয় সেগুলোতে প্রার্থীদের প্যানেল কে বা কারা তৈরি করেন?
১০) দলীয় লেজশূন্য লেখক-সাহিত্যিকদের নিয়ে গঠিত কমিটি কি আমরা কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদে আশা করতে পারি না?

আমার এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কে দেবে? অথচ সংসদের চলমান সমস্যার টেকসই স্থায়ী সমাধানের জন্য এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পাওয়া খুবই জরুরী।

পর্ব -২

লেখকের জন্য পরাধীন দায়িত্ব পালনটা খুবই কষ্ট এবং ক্ষতিকর। তাই কোথাও দায়িত্ব লাভের আশা বা চিন্তা করি না। দায়িত্ব না পেলে নারাজ হই না। কেউ কোনদিন বলতে পারবেন না যে আমি কোন দায়িত্ব লাভের জন্য লবিং বা চেষ্টা করেছি। আমি সাহিত্য সংসদের যে সকল কমিটিতে ছিলাম কোথাও কোনদিন উপ-কমিটি গঠনকালে নিজে দায়িত্ব লাভের চেষ্টা করিনি। আমাদের সময়ের সম্মানিত সভাপতি জনাব হারুনুজ্জান চৌধুরী আমাকে একদিন বললেন, তুমি কোন দায়িত্ব নিতে এগিয়ে এসো না কেন? আমি শ্রদ্ধার সাথে তাঁকে বলেছিলাম-হযরত নবী করিম (স.) এর সেই হাদিসটি যেখানে তিনি বলেছেন- তোমাদের মধ্যে যে দায়িত্ব নিতে চায় তাকে দায়িত্ব দেওয়া যাবে না, কারণ সে আমনতের খিয়ানতকারী। (মেশকাত শরিফ)। শ্রদ্ধেয় হারুনুজ্জামান চৌধুরীর কোরআন-হাদিসের মোটামোটি জ্ঞান রাখেন। তিনি নিজেও এই হাদিস পড়েছেন বলে জানান। অতঃপর তিনি বিভিন্ন সময় আমাকে বিভিন্ন দায়িত্ব দিয়েছেন। আমাকে যখন যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তা আমি চেষ্টা করেছি ঈমানদারীর সাথে পালনের। যেকোন দায়িত্ব ঈমানদারীর সাথে পালন করা যে কতটুকু কষ্টকর, তা একমাত্র দায়িত্বশীলরাই জানেন। আমার জীবনে আমি কোনদিন কোথাও দায়িত্ব লাভের জন্য নির্বাচনে দাঁড়াইনি। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দায়িত্বের জন্য নির্বাচনে দাঁড়াতে অনেকে বলেছেন, আমি মোটেও রাজি হইনি। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কমিটিতে আমাকে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও আমি যাইনি, কারণ আমার মূল পরিচয় আমি লেখক। এই অল্প-দীর্ঘ বয়সে কতো দায়িত্ব, কতো সংবর্ধনা, কতো আলোচনা সভার দাওয়াত, কতো ব্যবসা-বাণিজ্যের লোভকে যে এড়িয়ে আসতে হয়েছে, তা বলে লাভ নেই।

এবারের কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের নির্বচনে আমি একটা প্যানেলে থাকার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু যাইনি নিজের স্বাধীনসত্ত্বার সম্মানার্থে, নিজকে স্বাধীন রাখতে, নিজে স্বাধীনভাবে ভাবতে। সক্রেটিসকে সময়ের জালেম যখন হেমলক পানের নির্দেশ দিল তখন একজন সরকারী কর্মচারী হেমলকের পাত্র তাঁর সামনে নিয়ে গিয়ে কাঁদতে লাগল। তিনি তখন সেই ভক্তকে অভয় দিয়ে বলেছিলেনÑতুমি কাঁদছ কেন, তোমার তো কাঁদার কথা নয়। তুমি আজ আনন্দিত হবে যে, আমি আমার আদর্শের উপর প্রাণ বিসর্জন দিচ্ছি। যদি আমি তা না করে সময়ের সাথে আপোষ করতাম তবে মূলত আমার মৃত্যু ঘটত। কারণ, বিগতদিনে আমি দেখেছি এই প্যানেলকে একটি বিশেষদল নিয়ন্ত্রণ করে । তাদের এই নিয়ন্ত্রনের যোগ্যতা হলো-এই মুসলিম সাহিত্য সংসদে নাকি এই দলের সদস্যদের ভোট ব্যাংক রয়েছে। ইতোপূর্বে আমি বিভিন্ন সময় কমিটিতে থাকলেও বুঝতে পারিনি তাদের নিয়ন্ত্রণের মাত্রা কতটুকু, কিন্তু এবার যেহেতু সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলাম, তাই স্পষ্ট বুঝেছি তারা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। ওরা নিয়ন্ত্রণের জন্য কখনও সামনে আসে না, পিছন থেকে বিভিন্ন কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করে। ওরা কমিটি গঠনকালে যে নির্বাচন কমিশিন কঠন করে সেখানে তাদের নিজস্ব একজন ব্যক্তিকে বিগত বিশ বছর থেকে নির্বাচন কমিশনে রেখে দিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। পরবর্তীতে কমিটিতে থাকার লোভে চলমান কমিটির কর্তারা ওদের কথায় ওঠা-বসা করেন, নীতি নির্ধারণ করেন। এক্ষেত্রে কোন দলীল দেওয়া যাবে না, কিন্তু সবাই জানেন এবং বুঝেন বিষয়টি। আমি এই দলের নাম বলতে চাচ্ছিনা, কারণ কোন দলের সাথে আমার কোন শত্র“তা নেই। আমি কোনদল করি না এবং কোনদলের মৌন সমর্থকও নয়। তবে আমার পরিবারে সবদলেরই অস্তিত্ব রয়েছে।

আমি আমার মা-বাবার সূত্রে বৃটেনের বাসিন্দা হয়েছিলাম। ফিরে এসেছি মূলত স্বাধীনভাবে লেখালেখির কাকুতি বুকে নিয়ে। তাই আমি মনে করি, আমার লেখক পরিচয়ের উপরে আর কোন বড় পরিচয় নেই। কোন রাষ্ট্র প্রধান কিংবা কোন রাষ্ট্রেকেও আমার লেখক সত্ত্বা থেকে বড় মনে করি না। রাষ্ট্র আমাকে জেলে নিতে পারবে, ফাঁসী দিতে পারবে, কিন্তু আমার লেখক সত্ত্বাকে ধ্বংস করতে পারবে না। যেখানে রাষ্ট্রই গুরুত্ব পাচ্ছে না সেখানে ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান কোন বিষয়ই নয়। এখানেই আমার সাথে অনেকের মতানৈক্য এবং আমার প্রতি অনেকের ভুল ধারণা। কিছু করার নেই। আমার অভিজ্ঞতা, আমার পাঠ, আমার চিন্তা এবং চেতনা আমাকে এমন হতে বলেছে। আমি স্বাধীন, আমি স্বাধীন থাকতে চাই। একজন লেখকের জন্য স্বাধীনতা থেকে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু নেই। স্বাধীনভাবে মরে যাওয়া ছাড়া জীবনে কি পাওয়ার আছে একজন লেখকের? বিশ্ববিজয়ী আলেকজাণ্ডার যখন কর্ণিথ শহর দখল করে লোক পাঠালেন সেখানের লেখক-চিন্তক ডায়োজেনিসকে নিয়ে আসতে তখন ভাঙা ঘরে বসে ডায়োজেনিস বলছেন-স¤্রাটের সাথে তো আমার কোন প্রয়োজন নেই। তাঁর প্রয়োজন হলে বলেন এখানে আসতে। বৃদ্ধ ডায়োজেনিসের অহম দেখে কেঁপে উঠে স¤্রাটের দূত। ভয়ে ভয়ে সে স¤্রাটকে এসে সংবাদ দিলো। আলেকজাণ্ডার দূতের কাছে সংবাদ পেয়ে সাথে সাথে বেরিয়ে যান জায়োজেনিসের উদ্দেশ্যে। স¤্রাট গিয়ে দেখেন ডায়োজেনিস ঘরের সামনে রোদে বসে আছেন। জিজ্ঞাস করলেন-আমি কি আপনার কোন কাজে লাগতে পারি? ডায়োজেনিস চোখ না উঠিয়েই বললেন-আমার তোমার কাছে কোন কিছুর প্রয়োজন নেই। আমি এবং রোদের মধ্যখানে তুমি দাঁড়িয়ে আছ, সরে দাঁড়াও। আলেকজাণ্ডার মূর্খ ছিলেন না, তিনি বুঝে ফেললেন কি বলছেন এই বৃদ্ধ। তিনি কর্ণিথ শহর ছেড়ে চলে যান। একজন লেখকের এছাড়া আর কি পাওয়ার আছে যা কর্ণিথের সূর্য ডায়োজেনিস চেয়েছেন আলেকজাণ্ডারের কাছে? কেউ বলতে পারেন, এগুলো সত্যযুগের কথা। এখন চলছে কালির যুগ। তা হলে আসুন বাংলাদেশের দরিদ্র কবি ফররুখ আহমদের কথা বলি। যার ধন বলতে কিছুই ছিলো না ঢাকা রেডিওতে নিম্নায়ের একটি চাকুরী ছাড়া। ক্ষমতার লোভে নয়, তিনি আদর্শিক কারণে ছিলেন পাকিস্তানের পক্ষে। তবে কোনদিন পাকিস্তানের পশ্চিম অংশে যাননি। সবদেশের সব সরকারই বিভিন্ন জিনিষ দিয়ে বিভিন্ন লেখক-সাহিত্যিক-সাংবাদিকদের চিন্তা-চেতনাকে খরিদ করে। কাউকে করে সফরসঙ্গী, কাউকে দেয় গাড়ি-বাড়ি-চাকুরী আর কাউকে পাঠায় হজ্ব-উমরায়। কবি ফররুখ আহমদকেও তৎকালিন পাকিস্তান সরকার এমনটি করতে চাইলো। তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ধার্মিক। সরকার তাঁকে হজ্বে পাঠানোর প্রস্তাব দিলে তিনি স্পষ্ট বলে দিলেন-‘আমার উপর হজ্ব ফরজ হলে সরকারী টাকায় যেতে হবে না, আর হজ্ব ফরজ না হলে সরকারী টাকার অপচয় করা যাবে না।’ আরেকবার ওলপাকিস্তন রেডিও-এর এমডি ঢাকায় এসে হোটেল শেরাটনে বসে খবর পাঠালেন ঢাকা রেডিও-এর সাধারণ এক কর্মচারী ফররুখ আহমদকে দেখা করতে। ফররুখ স্পষ্ট বলে দিলেন-এমডির সাথে দেখা করবেন এমডি লেভেলের লোকেরা। আমি কেরাণী পর্যায়ের একজন কর্মচারীর সাথে এমডির কি প্রয়োজন? না, আমি যাবো না। অবশেষে এই এমডি কবি ফররুখ আমহদকে দেখতে তাঁর ভাঙাঘরে এসেছিলেন। ফররুখ সেদিন এমডিকে তাঁর ঘরে বসার জন্য একটি চেয়ারও দিতে পারেননি, তবু মাথা নত করেননি। এই ছিল একজন লেখকের অহম। অহমকে অনেকে অহংকার ভেবে ভুল করেন। অহম আর অহংকার এক নয়। অহম মানুষের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর অহংকার ধ্বংসাত্মক।

প্রশ্ন হলো, এবারের নির্বাচনের সাথে এসবের সম্পর্ক কি? সম্পর্ক দেখলে সম্পর্ক, না দেখলে নেই। আমি মনে করি ছোট শহরের ছোট ঘটনা, বড় শহরের বড় ঘটনা। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি প্যানেল গঠন প্রক্রিয়ায় বেশি ভোটের মালিকেরা লেখকদের সাথে অনেকটা মুনিব-গোলামের ব্যবহার করেছেন। এটা তারা প্রতিবারই করে থাকেন। তাদের প্যানেলই প্রতিবার নির্বাচিত হয়ে কমিটি গঠন করে থাকে। তাদের বেশি ভোটারের অহংকার তাদেরকে অনেকটা স্বৈরাচারী মনোভাব এনে দিয়েছিল। তারা মনে করেছেন, ভোটতো আমাদের হাতে, আমরা যাকে চাইবো তাকে রাখবো, যাকে চাইবো তাকে সরাবো। এবারের নির্বাচনে সবার মুখে একটা কথা প্রায় শোনা যায়-হাইকামান্ডের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। কিন্তু প্রশ্ন হলো-হাইকামান্ড কে বা কারা? হাইকামান্ড হাইকামান্ড শোনতে শোনতে মনে কষ্টের হাওয়া জমতে জমতে কান লাল হয়ে যায়। একসময় আমার মনে হলো, এই প্যানেলে যাওয়া আর লেখক সত্ত্বার আত্মহত্যা সমার্থক।

আমি খুব দুঃখ পাই যখন দেখি, আমার এবং আমার শহরের গরীব লেখকদের সত্ত্বাকে হত্যার জন্য টাকা ওয়ালারা-দলান্ধরা তৎপর। তিন হাজার টাকা খরচ করে কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের মেম্বার হওয়ার সাধ্য প্রায় লেখকেরই নেই। ফলে দিনদিনে সংসদের জীবন সদস্যের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি লেখকদের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। বর্তমানে সতেরশ ভোটার। এই ভোটারদের ক’জন লেখক? এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের ভবিষ্যৎ খুবই অন্ধকার। বড় বিল্ডিং আর বাণিজ্যিক ভবনের নাম তো কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ নয়, কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ হলো বই পাঠকদের একটু শ্বাস ফেলার স্থান-পাঠাকার, নতুন লেখকদের পাঠশালা-সাপ্তাহিক সাহিত্য আসর, আর নবীন এবং প্রবীণ লেখকÑসাহিত্যিকদের মিলবন্ধনের প্লাটফরম-সংসদ অফিস, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতিময় শহীদ সোলেমান হল, ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী পত্রিকা আল-ইসলাহ। (চলবে)

You may also like

Leave a Comment


cheap mlb jerseyscheap nhl jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseys