উপমহাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড

by News Room

নিউজ ডেস্ক:দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের তালিকায় সর্বশেষ নিহত হয়েছিলেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর নাম। তার এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো, বিশ্বের এই অঞ্চলে গত অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে যে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড চলে আসছে তা অব্যাহতই থাকবে। ঘাতকদের বুলেট অথবা বোমা হয়তো এই অঞ্চলের আরো অনেক রাজনীতিক ও রাষ্ট্রনায়কের জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেবে। বুলেট ও ব্যালটের যে দ্বন্দ্ব এবং সংগ্রাম চলে আসছে তাতে বুলেটের ওপর ব্যালটের বিজয় কবে নাগাদ অর্জিত হবে তা বলা অসম্ভব। আমরা আজ উপমহাদেশের আলোড়ন সৃষ্টিকারি কয়েকটি হত্যাকান্ডের কথা জানবো।ভারতে হত্যাকাণ্ড
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পরের বছরই ভারতে প্রথম রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। ১৯৪৮ সালের ৩১ জানুয়ারি সকালে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে উগ্রপন্থী হিন্দু নাথুরাম গডসে গুলি করে হত্যা করে রাজধানী নয়াদিল্লির বিরলা হাউসের এক প্রার্থনা সভায়। এ ঘটনার প্রায় ৩৭ বছর পর ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তার শিখ দেহরক্ষীদের গুলিতে নিহত হন। শিখদের পবিত্র ধর্মীয় স্থান ও উপাসনালয় পাঞ্জাব রাজ্যের অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে সেনা অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। ওই মন্দিরে স্বাধীনতাকামী শিখ সশস্ত্র যোদ্ধারা আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। তাদের নির্মূল করতেই ইন্দিরা ওই সেনা অভিযানের নির্দেশ দেন। এ অভিযানে অনেক শিখ নিহত হয়। এ ছাড়া উপাসনালয়ের মতো পবিত্র স্থানে বুট পরা সৈন্যদের প্রবেশের মাধ্যমে ধর্মীয় স্থানকে অপবিত্র ও এর অমর্যাদা করার ঘটনাকে শিখরা ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখেনি। তারই প্রতিশোধ হিসেবে ইন্দিরা গান্ধীকে নয়াদিল্লিতে সরকারি বাসভবনে তার শিখ দেহরক্ষীরা গুলি করে হত্যা করে। এ হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় ওই বছরই নয়াদিল্লিতে শিখবিরোধী দাঙ্গায় প্রায় ২ হাজার শিখ নারী-পুরুষ-শিশু নিহত হয়।

ইন্দিরাপুত্র রাজিব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তার জীবনেও ঝুঁকি নেমে আসে। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কায় সেনা পাঠিয়ে তিনি তামিল গেরিলাদের বিরাগভাজন হন। শ্রীলঙ্কা সফরকালে এক সেনা সদস্য তাকে হত্যার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। কিন্তু ১৯৯১ সালের ২১ মে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়–তে কংগ্রেসের এক নির্বাচন প্রচারাভিযানে অংশ নিতে গিয়ে তিনি তামিল গেরিলাদের আত্মঘাতী হামলায় নিহত হন। রাজিব গান্ধীর ছোট ভাই সঞ্জয় গান্ধী রাজনৈতিক কারণে নিহত না হলেও বিমান চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারান।পাকিস্তানে হত্যাকাণ্ড
পাকিস্তানে প্রথম রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় ১৯৫১ সালে। ওই বছরের ১৬ অক্টোবর রাওয়ালপিন্ডির এক জনসভায় যোগদানকালে পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারান। আততায়ী লিয়াকত আলী খানের বুকে দু’বার গুলি করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে। নিহত হওয়ার পর পাকিস্তান সরকার তাকে ‘শহীদ-ই-মিল্লাত’ উপাধিতে ভূষিত করে।

লিয়াকত আলী খানের হত্যাকাণ্ডের প্রায় পাঁচ দশক পর পাকিস্তানের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) প্রতিষ্ঠাতা জুলফিকার আলী খান ভুট্টোকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ড ঘটান ভুট্টোরই একসময়ের প্রিয় পাত্র ও পরে ভুট্টোকে হটিয়ে ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল জিয়াউল হক। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার জন্য বর্তমান পাকিস্তানের সেনাবাহিনী জুলফিকার আলী ভুট্টোর একগুঁয়েমি ও গোয়ার্তুমিকেই অনেকাংশে দায়ী করে থাকেন। সে জন্য তার ওপর সেনাবাহিনীর যথেষ্ট ক্ষোভ রয়েছে বলে অনেক সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন। ১৯৭১ সালের পর ভুট্টোর হাতেই পাকিস্তানের ক্ষমতা ছেড়ে দেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। ভুট্টো তার ওপর সেনা কর্মকর্তাদের ক্ষোভের কথা জানতেন। সে জন্য তিনি ক্ষমতা গ্রহণের পর পর্যায়ক্রমে অনেক সিনিয়র সেনা কর্মকর্তাকে অবসর প্রদান করেন। ১৯৭৩ সালে ভুট্টো তার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে ৫৯ জন সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করেন। পরে তাদের কোর্ট মার্শালে বিচার করা হয়। ভুট্টো ওই কোর্টের চেয়ারম্যান করেছিলেন ওই সময়ের ব্রিগেডিয়ার জিয়াউল হককে। পরে তাকে দ্রুত পদোন্নতি দেয়া হয় এবং ১৯৭৬ সালে ৫ জন সিনিয়র জেনারেলকে ডিঙিয়ে জিয়াউল হককে সেনাপ্রধান করেন ভুট্টো।

জিয়াউল হক সেনাপ্রধান জেনারেল টিক্কা খানের স্থলাভিষিক্ত হন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস এটাই যে, এই জিয়াউল হকই ১৯৭৭ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে গ্রেফতার করেন। পরে একটি হত্যা মামলায় প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে ১৯৭৯ সালের ৪ এপ্রিল ভুট্টোকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়।জুলফিকার আলী ভুট্টো জেলখানায় বসে ‘আমাকে হত্যা করা হলে’ নামে যে বইটি লিখেছেন তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন, পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করার জন্য তাকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বারবার চাপ দেয়া হয়েছে। হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭৬ সালে ভুট্টোকে এই বলে হুমকি দিয়েছিলেন, পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ না করলে তাকে চরম মূল্য দিতে হবে। ভুট্টোর এই তথ্য প্রকাশ থেকে অনেকেই ধারণা করে থাকেন, ভুট্টোর বিচার প্রক্রিয়া ফাঁসির ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের হাত থাকতে পারে। উল্লেখ্য, ভুট্টোর আমলের প্রথম দিকে ১৯৭২ সালে পাকিস্তানে পারমাণবিক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। জেনারেল টিক্কা খানকে এ কর্মসূচি এগিয়ে নেয়ার জন্য দায়িত্ব দিয়েছিলেন ভুট্টো।

জুলফিকার আলী ভুট্টোর হত্যাকাণ্ডের পর অনেকেই এই মত প্রকাশ করেছিলেন, জেনারেল জিয়াউল হকেরও একইভাবে মৃত্যু হবে। ১৯৮৮ সালে এক রহস্যময় বিমান দুর্ঘটনায় জেনারেল জিয়াউল হক নিহত হন। তার সাথে ওই বিমানে বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন সেনাকর্মকর্তা, মার্কিন রাষ্ট্রদূতসহ কয়েকজন কূটনীতিক ছিলেন। রহস্যময় সেই বিমান দুর্ঘটনার কারণ আজো জানা যায়নি।

জুলফিকার আলী ভুট্টোর ছোট ছেলে শাহনেওয়াজ ভুট্টো ফ্রান্সে থাকতেন। জেনারেল জিয়াউল হক ১৯৭৯ সালে যখন জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেন তখন শাহনেওয়াজ অক্সফোর্ডের ছাত্র ছিলেন। ওই সময় তিনি ও তার বড় ভাই মুর্তজা ভুট্টো পিতার প্রাণ রক্ষায় আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার কাজ চালান। কিন্তু তাদের সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ১৯৮৫ সালের ১৮ জুলাই ফ্রান্সের অ্যাপার্টমেন্টে শাহনেওয়াজকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয় বলে ভুট্টো পরিবার তখন অভিযোগ তুলেছিল। ১৯৯৬ সালে বেনজির ভুট্টো যখন প্রধানমন্ত্রী তখন তারই আরেক ভাই মুর্তজা ভুট্টো করাচিতে রহস্যজনকভাবে গুলিতে প্রাণ হারান। বেনজির তখন এই হত্যাকাণ্ডের জন্য পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইকে দায়ী করেছিলেন। কিন্তু সেনাবাহিনী এ অভিযোগ নাকচ করে দেয়। এই হত্যাকাণ্ডের কোনো কিনারা হয়নি আজ পর্যন্ত। সর্বশেষ ২০০৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর বেনজির ভুট্টো আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারালেন রাওয়ালপিন্ডিতে। ওই বছর ১৮ অক্টোবর নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে করাচিতে আত্মঘাতী হামলা থেকে অল্পের জন্য বেঁচে গেলেও দ্বিতীয় হামলা থেকে আর রক্ষা পেলেন না। এখন তার ছেলে বিলাওয়াল জারদারি ভুট্টো পিপিপি’র নেতৃত্ব গ্রহণ করেছেন। মৃত্যুর আগে দুবাইতে ভারতের আউটলুক পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বেনজির ভুট্টো বলেছিলেন, তিনি আশা করেন তার সন্তানরা জীবনে ভিন্ন পথে হাঁটবে, রাজনীতিতে না এসে ভিন্ন জীবন বেছে নেবে। বেনজির আরো বলেন, ‘যদিও আমি রাজনৈতিক পরিবার থেকে এসেছি এবং দেশের প্রতি আমার দায়িত্ব-কর্তব্য রয়েছে, কিন্তু আমি আমার সন্তানদের পরামর্শ দেবো রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে। অন্যভাবেও দেশের জন্য কাজ করার পথ খোলা রয়েছে। ডাক্তার, সমাজকর্মী বা অন্য যেকোনোভাবেই দেশ সেবা করা যায়। আমার সন্তানরা আমাকে বলেছে, তারা আমার নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। আমি তাদের সেই আশঙ্কাকে বুঝতে পারি। কিন্তু তারা পরিবারের রক্ত বহন করছে, জীবনে যাই ঘটুক না কেন, তা আমাদের সাহসের সাথেই মোকাবেলা করতে হবে।’ বেনজির না চাইলে কী হবে, তার ছেলে বিলাওয়ালই শেষ পর্যন্ত পিপিপি’র নেতৃত্ব পেয়েছেন। তার ভাগ্যে কী আছে তা নিয়তিই কেবল বলতে পারেন।বাংলাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা, স্বাধীন বাংলাদেশর স্থপতি সাবেক প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক সেনা অভ্যুত্থানে সপরিবারে নিহত হন। তার দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ওই সময় দেশের বাইরে অবস্থান করায় তারা প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্যও তার জনসভায় গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল। শেখ হাসিনা অল্পের জন্য বেঁচে যান। ১৯৮১ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হন।

শ্রীলঙ্কায় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড

দ্বীপদেশ শ্রীলঙ্কায় প্রথম রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় ১৯৫৯ সালে। ওই বছর দেশটির প্রধানমন্ত্রী সলোমন বন্দরনায়েকে আততায়ীর হাতে নিহত হন। একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু তাকে গুলি করে হত্যা করে। এর প্রায় তিন দশক পর প্রেসিডেন্ট রানাসিঙ্গে প্রেমাদাসা নিহত হন আত্মঘাতী হামলায়। ১৯৯৩ সালের ১ মে রাজধানী কলম্বোয় মে দিবসের র‌্যালিতে অংশগ্রহণকালে তিনি তামিল টাইগারদের আত্মঘাতী হামলায় নিহত হন। এ ছাড়া ১৯৯৪ সালে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ও বিরোধীদলীয় নেতা গামিনী দিশানায়েকে আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হন। এরপর পাঁচ বছর পর ১৯৯৯ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গাকে হত্যার জন্য তামিল মহিলা আত্মঘাতী হামলার চেষ্টা চালালেও চন্দ্রিকা অল্পের জন্য বেঁচে যান। কিন্তু হামলায় তার একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়।নেপাল ও ভুটানে হত্যাকাণ্ড

নেপালে ২০০১ সালে রাজা বীরেন্দ্র তার রাজপ্রাসাদে সপরিবারে নিহত হন অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে। পরে রাজা হন তার ছোট ভাই জ্ঞানেন্দ্র। ভুটানে ১৯৬৪ সালে নিহত হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জিগমে পালদেশ দরজি।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় উত্তরাধিকারের বা পারিবারিক আধিপত্যের রাজনীতি ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের যে ধারা চালু রয়েছে তা থেকে বেরিয়ে আসার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের কারণে এই অঞ্চলে রাজনীতির পথও খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। উগ্রপন্থী গ্রুপের হামলা, সামরিক অভ্যুত্থানসহ নানাদিক থেকেই এই অঞ্চলের রাজনীতিকদের জীবন ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

You may also like

Leave a Comment


cheap mlb jerseyscheap nhl jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseys