নারী কেন নারীর শত্রু?

নলিনী চৌধুরী:
আমরা প্রায়ই ঢালাওভাবে একটা কথা শুনে থাকি বা বলেও থাকি নারীই নারীর শত্রু, নারীই নারীকে হিংসা করে নারীই নারীর মুক্তির রাস্তাকে স্তব্ধ করে দিচ্ছে। কথাটা কোনভাবেই অস্বীকার করার সুযোগ না থাকলেও আমরা সচেতন মনে কথাটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি, কেননা, নারী একদিকে দুর্বল, আবার তাকেই যদি অপরাধী বলে তার দিকে আঙুল তাক করি, তাহলে সেটা হজম করে নেওয়া নারীর জন্য অসম্ভব হতে পারে, কিংবা নারী নির্যাতন আরও বাড়তে পারে সে আশঙ্কায়। কিন্তু সত্যকে ধামাচাপা দিয়েই যে কোন মুক্তিই সম্ভব নয়, সেটা আমরা খুব ভালভাবেই জানি।

. যখনই আমরা ঢালাওভাবে বলে থাকি, নারীই নারীর শত্রু, তখন আমরা বড় ধরণের ভুল করে থাকি। কেননা সকল নারীই, সকল নারীর শত্রু নয়। নারী হচ্ছে মায়ের জাত, এজন্য নারী প্রকৃতিগতভাবেই মায়া নামক একটা বিশেষ গুণ নিয়ে জন্মায়। পুরুষকে যেখানে তলোয়ার হাতে নিতে হয়, সেখানে একজন নারীকে মায়া দিয়ে সমস্যার সমাধান করার অনেক ইতিহাস আমাদের অতীতে আছে। একজন মায়ের কাছে তার মেয়ে মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ, বোনের সাথে বোনের সম্পর্ক, ফুফুর সাথে ভাতিজির সম্পর্ক, খালার সাথে ভাগ্নির সম্পর্ক রক্তের মায়ায় আবদ্ধ। এরকম অনেক সম্পর্কই আছে আমাদের। এ সম্পর্কগুলোর মধ্যেই রক্তের মায়ার বন্ধন থাকলেও অনেকেরই এই সম্পর্কগুলোরও টানাপোড়ন দেখা যায়। বোঝাবোঝির অভাবে এই সম্পর্কগুলোও অনেক সময় নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তবে এখানে কারও সাথে কারও সম্পর্ক না থাকলেও কোন নির্যাতনের বিষয় কাজ করেনা। সুতরাং এখানে এই সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখে যদি কেউ বলেন, নারী নারীর শত্রু, তাহলে সেটা নিতান্তই ভুল কথা এতে কোন সন্দেহ নেই। কেননা, এই সমস্যাটা নারীকেন্দ্রীক নয়।

. নারী নারীর শত্রু তখনই হয়ে ওঠেন, যখন কোন নারী নির্যাতনের কারণ আরেকজন নারী থাকেন এবং সে নারী যদি সমাজের প্রচলিত কোন পদ্ধতিকে ব্যবহার করে সে নির্যাতন চালিয়ে থাকেন। এ ধরণের বিষয়গুলো চিহ্নিত করতে গেলে দেখা যায়, ননদ এবং শাশুড়ি প্রকৃত নির্যাতনকারী। যদি কোন নারী দ্বারা কোন নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে প্রথমে শাশুড়ি এবং ননদ দ্বারা ঘরের বউটি নির্যাতনের শিকার হন। বিয়ের পর ঘরের নতুন বউ সংখ্যালঘু হয়ে যান। সে হিশেবেও তিনি নির্যাতনের শিকার হতে পারেন। আর নির্যাতন সহ্য করে শাশুড়ি, ননদের উপর শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা হারিয়ে, আত্মসম্মানকে জলাঞ্জলি দিয়ে যারা শ্বশুরবাড়িতে টিকে থাকেন, পরবর্তীতে তারা শাশুড়ি এবং ননদের উপর প্রতিশোধ নেন এবং মৃত্যুর আগে বউমার দ্বারা শাশুড়ি নির্যাতনের শিকার হন, ননদেরাও কোননা কোনভাবে শিক্ষা পান।

. এখন বলতে হবে, এই নির্যাতনের মূল ভিত্তি কী, তাহলে বিষয়টা হয়ত একটু পরিষ্কার হবে। এই নির্যাতনের মূল ভিত্তিও আসলে পুরুষকেন্দ্রিক। ছেলে যখন মা-বোনের হাতে থাকে তখন তারাই নাটাই ঘোরান নিজের মতো করে। আবার ছেলে যখন বউয়ের হাতে থাকে তখন বউও নাটাই ঘোরান নিজের মতো করে। অর্থাৎ পুরুষ পক্ষ অপর পক্ষকে নির্যাতন করছেন। তাহলে নারী নারীর শত্রু হওয়ার পেছনেও কিন্তু পুরুষই রয়েছেন, পুরুষতন্ত্র রয়েছে, পুরুষতান্ত্রিক নারীর অবদান রয়েছে।

. এরকম জটিল সমস্যার সমাধান কী সেটা খুঁজতে হলে সেই প্রশ্নেই আগে যেতে হবে, নারী কেন নারীর শত্রু? যখন একই মানুষের উপর সমস্তটা পরিবার নির্ভর থাকে তখন সবাই চায়, পরিবারের উপার্জনকারী ব্যক্তিটা যেন তার পক্ষে থাকে। ছেলে বিয়ে দেওয়ার পর মা-বোনের আশঙ্কা থাকে ছেলে চলে গেলো বলে, বউয়ের ধোঁকা এই শুনলো বলে! তাছাড়া, নতুন মেয়েটি যখন ঘরে আসলো, তখন শাশুড়ির এক ধরণের হিংসে হয় এটা ভেবেই এত দিনের গড়া সংসার কেন তিনি অন্যের মেয়েকে দিয়ে দিবেন। ননদের ভেতরেই ক্ষোভ থাকে কেন আমাদের গড়া সংসার আরেকটা মেয়ে এসে জুড়ে বসবে। এ ধরণের হিংসে, হীনমন্যতাবোধ থেকে তারা নতুন বউকে কষ্ট দিতে চায়, খাবার-দাবারে কষ্ট দেওয়া, কথা দিয়ে কষ্ট দেওয়া এগুলো করে থাকে।

. আরও অনেক ব্যাপার আছে। যেমন, কিছু মানুষ একদম ছোটবেলা থেকেই শিখে এসেছেন, অন্যের সম্পদ ভোগ করার মধ্যে কৃতিত্ব আছে, যেভাবে ডাকাতির মধ্যে ডাকাত কৃতিত্ব খুঁজেন। যিনি একদম শিশু থেকেই তার পরিবারে উদারতার শিক্ষা পাননি, যিনি দেখেছেন তার মা-খালারা বউয়ের সাথে ভয়ঙ্কর আচরণ করেছেন, তিনি স্বাভাবিকভাবেই তার নিজের ছেলের বউয়ের সাথে ভালো আচরণ করতে পারেননা। প্রথমত, একজন খারাপ মানুষের কাছে যিনি থাকবেন তিনিই অত্যাচারের শিকার হবেন। দ্বিতীয়ত, যে মানুষ সবসময় অন্যের খেয়েছেন, কিন্তু কাউকে কখনো কিছু দেননি, তিনি বউয়ের সাথেও তেমনই আচরণ করবেন, কেননা অভ্যাস ছেড়ে দেওয়া সহজ কথা নয়। প্রতিটা মানুষ তার দৈহিক এবং মানসিকভাবে যেমন আলাদা, তেমনি আচরণের দিক থেকেও আলাদা। একজন সুস্থ, সভ্য মানুষের শত্রুতার পদ্ধতি আর একজন অসুস্থ বর্বর মানুষের শত্রুতার পদ্ধতি এক নয়। ছোট মনের মানুষ আর হাড় কিপ্টের কাছে কেউ থাকতে গেলে কিংবা চলতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হবেনা। তাকে কষ্ট ভোগ করতে হবে। আর যদি মনিব হয়ে থাকেন কোন ছোটলোক আর দাস হন কোন উদার সহজসরল মানুষ, তাহলে সেই উদার সরল মানুষটা কতটুকু নির্যাতনের শিকার হবেন, সেটা ভাবতেও গাঁ শিউরে ওঠে। আসলে, এখানে পুরুষ নারী আলাদা কিছু না। পার্থক্য কেবল এটাই, নারী অন্যায়, অবিচার প্রয়োগ করার সুযোগ পাচ্ছেন, পুরুষ সেটা পাচ্ছেননা!

. পুরুষতন্ত্র শাশুড়ি বউয়ের মধ্যে এক ধরণের শত্রুতা সৃষ্টি করে ঠিকই, কিন্তু ছোটলোকের শত্রুতা আর সভ্য মানুষের শত্রুতা একরকম নয়। শাশুড়ি যদি বিবেকহীন চরম ছোটলোক হন তাহলে সে পরিবারে কখনও কোন বউকে টিকে থাকা সম্ভব না। আর শাশুড়ি যদি উদার, বড়মনের মানুষ হন, তবে সে সংসারে শাশুড়ি বউয়ের শত্রুতা থাকলেও বউকে টিকে থাকা সম্ভব হয়। একদিন এ সংসার সুখী হবে, সে স্বপ্ন দেখা যায়।

. কিছু কিছু মেয়ে অনেক কষ্ট করে বাবার সংসার সাজানোর পরে এটা ত্যাগ করে তাকে যেতে হয়, যে ত্যাগের মধ্য দিয়ে কখনোই কোন পুরুষকে যেতে হয়না। আবার পরিবার ছেড়ে অন্যের বাড়িতে যাবার পর নোংরা আচরণ সহ্য করে নিয়ে মেয়েদের টিকে থাকার মতো বড় চ্যালেঞ্জও কোন পুরুষকেই কখনো নিতে হয়না। তাহলে পুরুষের চেয়ে মেয়েদের দায়িত্ব অনেক অনেক বেশি। আবার সন্তান জন্মদানের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এবং ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির দিকে কখনোই কোন পুরুষকে যেতে হয়না। একটা সন্তান জন্মদান একজন নারীর জন্য কতটা কষ্টের এবং যন্ত্রণাদায়ক সেটা কখনোই কোন পুরুষ কল্পনা করতে পারবেননা। একজন মানুষ যখন উদ্বাস্তু হয়ে যান এবং অনেক বড় নোংরামি এবং চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়, তখন নিশ্চয় কোন রোমান্টিকতা তার মধ্যে থাকবেনা। এতকিছুর পরে যখন নারীকে আবার শেকল বেঁধে গৃহবন্দী করে রাখা হয়, তখন তার সাথে জানোয়ারসুলভ আচরণ ছাড়া আর কিছু করা হয়না, এবং তিলে তিলে তিনি নিজেও জানোয়ার হয়ে ওঠেন।

. আবার আমাদের এই সুশীল পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বিভিন্নভাবে নাটকও করে থাকে! আমাদের সমাজে কিছু অদ্ভুত নিয়ম আছে, যেমন, শাশুড়ি বউকে যতোই নির্যাতন করুকনা কেন, বউ একটা কিছু বললেই সে বেয়াদব। শাশুড়ি সম্পর্কে যেকেউ বলেন, “উনারতো দিন শেষ, উনি আর কতদিন বাঁচবে! যে কয়টা দিন আছে এমন করেই চলে যাক, তারপর তো শেষ। উনার এসব দোষ ধরে কোন লাভ নেই।” কী অদ্ভুতভাবে অপরাধের পক্ষে আমাদের সমাজ! আজকের শাশুড়ি তার বউয়ের সাথে যা করছেন, সেই নির্যাতিত বউ তার বউয়ের সাথে ওতো এমনই আচরণ করবেন! সেই শাশুড়ির মেয়েরা যখন শাশুড়ি হবেন, তখন মায়ের কাছ থেকে পাওয়া আজীবনের সেই শিক্ষাটাই তো প্রয়োগ করবেন! এভাবেই তো যুগের পর যুগ কোন অপরাধ টিকে থাকে, শক্তিশালী হয়। মানুষ একদিন বেঁচে থাকলেও তাকে মানুষ হয়েই বেঁচে থাকতে হবে, থাকতেই হবে। জানোয়ার হওয়ার অধিকার কারও নেই। কারও জানোয়ারসুলভ আচরণকে সমর্থন করার অধিকারও কারও নেই। যদি কেউ পাগল হয়ে থাকেন, তবে তাকে সেভাবেই ব্যবস্থা করতে হবে। আর তিনি যদি স্বীকৃত সুস্থ মানুষ হন, তবে তাকে সুস্থ হয়েই বাঁচতে হবে।

. সমস্যাগুলো অনেক জটিল হলেও এর সমাধানও আছে। নোংরামি থেকে সবার আগে নারী সমাজকেই বের হয়ে আসতে হবে। নারী নারীকে হিংসে করবেননা, বরং নারীকে বুঝতে হবে, অন্য নারী এগিয়ে গেলে তার নিজের মুক্তির রাস্তা উন্মুক্ত হবে। শাশুড়িকে মানতেই হবে, তিনিও একদিন গড়া সংসার পেয়েছেন, তাকেও হাসিমুখে এ সংসার অন্যের কাছে ত্যাগ করতে হবে, আজকের বউও আগামী দিনে এ সংসার অন্যকে দিবেন। তিনিও স্বামী পেয়েছেন, আরেকজন নারীই তার স্বামীকে জন্ম দিয়েছিলেন, তিনিও সন্তান জন্ম দিয়েছেন, যিনি অন্যের স্বামী হয়েছেন, বউমাও একদিন ছেলে জন্ম দিবে, যে অন্যের স্বামী হবে। ননদদের বুঝে নিতে হবে, যে ভাবীটি ঘরে এসেছে, সেও কিন্তু তার নিজ হাতের সাজানো সংসার ছেড়ে এসেছে তার ভাবীর জন্য। এটা সমাজের ধরাবাঁধা নিয়ম, এই নিয়মের জন্য সমাজ এবং সামাজিক পদ্ধতি দায়ী হতে পারে, নির্যাতিত, নির্যাতনকারী এমনকি সমাজের সকল মানুষ দায়ী হতে পারে, কিন্তু একা কখনোই গৃহবধূটি দায়ী নয়। এমনকি এমনও হতে পারে, গৃহবধূই এ নিয়ম থেকে মুক্তি চান, কিন্তু তিনি কোনভাবেই মুক্ত হতে পারছেননা!

. নারীকে মানুষ হতে হলে তাকে পুরুষনির্ভর জীবন থেকে বের হয়ে আসতে হবে, অর্থ উপার্জন করতে হবে, মানসিকতাকে বড় করতে হবে, মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন হতে হবে। ছেলের উপর মা অর্থনৈতিকভাবে নির্ভর হবেননা, ভাইয়ের উপর বোন নির্ভর হবেননা, স্বামীর উপর স্ত্রী নির্ভর হবেননা। আর গৃহবধূ কারও ঘরের কোন চাকরানি কিংবা দাস নয় যে, তাকে একাই ঘরের সকল কাজ করতে হবে। ঘরের কাজ সবাইকে মিলেমিশে করতে হবে। একজনের উপর চাপিয়ে দিলে সেটা নির্যাতনের আওতায় পড়ে। নারী, পুরুষ সবাই অর্থ উপার্জন করবেন, সবাই কাজ করবেন, এটাই নিয়ম হতে হবে। ছেলেকে বিয়ে দেবার পর শাশুড়ি, ননদ অনেকসময় অবসরে চলে যান, ঘরের কোন কাজ করেননা, বউকে যুক্তি দেখান, আমরা এতোদিন করেছি, তুমি এখন করো। তাদের কাণ্ডজ্ঞান থাকলে তাদের ভাবা উচিৎ, ঘরের বউটিও তার বাবার বাড়িতে এতোদিন কাজ করে এসেছেন, সেও রক্তে মাংসে মানুষ, নতুন জায়গায় এসে তারও অনেক কষ্ট হচ্ছে, তারও ভালোবাসা প্রয়োজন। নারী গৃহবন্দী জীবন থেকে বের হোক, অর্থ উপার্জন করুক, নিজের পায়ে দাঁড়াক, মানুষ হোক, মানসিকতাকে অনেক বড় করে তুলোক, নারীকে হিংসে না করে নারীর পাশে দাঁড়াক, পুরুষ নির্ভর জীবন থেকে মুক্তি পাক, এই কামনা।

লেখক: প্রভাষক,গল্পকার , সাংবাদিক ও মুক্তমনা কলাম লেখক।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*