সিলেট বিভাগের বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি

নিউজ ডেস্ক: ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় এক সপ্তাহের মাথায় বৃহত্তর সিলেট বিভাগে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি। বিভিন্ন উপজেলার রাস্তাঘাট, হাট-বাজার, বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদ্রাসা এমনকি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সরকারি ভবনগুলোতেও পানি ঢুকে পড়েছে।নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। সুনামগঞ্জের পরিস্থিতি খারাপ। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৫ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার ও ৩শ মেট্রিক টন চালের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবদুল আহাদ।

তিনি জানান, কিছু এলাকায় খাবার ও ত্রাণ পাঠানো হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর জেলার সকল মসজিদে বিশেষ মোনাজাত ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয় জেলা প্রশাসকের অনুরোধে।

এদিকে ভারতের বরাক নদীর পানি প্রবল বেগে সীমান্ত উপজেলা জকিগঞ্জের নিকট অমলসীদে প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছে। অমলসিদে বরাকের পানি দশমিক ১৩ সেন্টিমিটার বেড়ে শুক্রবার সন্ধ্যায় বিপদসীমার দশমিক ৮৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে কুশিয়ারায়।

সুনামগঞ্জে শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় সুরমার পানি বিপদসীমার ৮৭ সেন্টিমিটার উপরে প্রবাহিত হচ্ছিল। কানাইঘাটে ও সিলেটে সুরমা, অমলসিদে ও শেওলায় কুশিয়রা, মৌলভীবাজার ও শেরপুরে মনু নদীর পানি আরো বৃদ্ধি পেয়ে অনেকগুলোই বিপদসীমার ওপরে।

সুনামগঞ্জে ৩শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত হয়েছে। বন্ধ হয়েছে অর্ধেকের বেশি। সিলেটে ৬০ প্রতষ্ঠিানে পাঠদান বন্ধ। সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের অন্তত দেড় লাখ মানুষ পানি বন্দী হয়ে পড়েছে। এই তিন জেলায় একহাজার ৯৯৩ হেক্টরের আউশ, বোনা আমন ও রোপা বীজতলা নিমজ্জিত হয়েছে বলে কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়। এর মধ্যে সুনামগঞ্জেই এক হাজার ৩৮৮ হেক্টর।

অন্যদিকে বিভিন্ন স্থানে বিশুদ্ধ পানি, জ্বালানি ও গবাদি পশুর খাদ্যের অভব দেখা দিয়েছে। গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌছানো যাচ্ছে না এবং দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। শাক-সবজি, মাছের অভাব দেখা দিয়েছে। সুরমা অববাহিকায় পানির চাপ বেশি থাকায় সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট, জাফলং, কোম্পানীগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জের ১১টি উপজেলার হাজার হাজার মানুষ পানি বন্দী। অনেকের বাড়িতে নৌকা নেই, তাই তারা ঘর থেকেও বের হতে পারছেন না।

গোয়াইনঘাট উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল হাকিম জানান, এখানে এলাকার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। পাথর কোয়ারি বন্ধ। শ্রমিকরা বেকার। ৪০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। গোয়াইনঘাটের ইউএনও বিশ্বজিত কুমার পাল জানান, বন্যা পরিস্থিতির রিপোর্ট তৈরি করা হচ্ছে।

কোম্পানীগঞ্জের ইসলামপুর ইউপি চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন জানান, ঘরবাড়ি ও অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ডুবে গেছে। অন্যতম পর্যটন স্পট সাদা পাথর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ও প্রবল স্রোতের কারণে কয়েক হাজার পর্যটক ফিরে যাচ্ছেন। ধলাই, পিয়াইন ও জাহাজ খালি অববাহিকায় পানি বৃদ্ধির ফলে উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে যাচ্ছে। বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে।

কোম্পানীগঞ্জ ইউএনও বিজেন ব্যানার্জী জানান, বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মেডিকেল টিম গঠন করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে।

সুনামগঞ্জে ১১টি উপজেলার ১৩ হাজার লোক ক্ষতিগ্রস্ত: সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। শুক্রবার বেলা ৩টায় সুনামগঞ্জের সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৮৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সরকারি হিসাবে বন্যায় সুনামগঞ্জের প্রায় ১৩ হাজার ১০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক কর্মস্থলে থাকার এবং আশ্রয়কেন্দ্রগুলো সব সময় খোলার রাখার নির্দেশনা দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, সুনামগঞ্জের ১৩ হাজার একশ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার মধ্যে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ২৯৫০, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় ১৪০০, তাহিরপুর উপজেলায় ৪১০০, দোয়ারাবাজার উপজেলায় ২৮৫০ এবং জামালগঞ্জ উপজেলায় ১৮০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব পরিবারের সহায়তায় জন্য সুনামগঞ্জ সদর, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, জামালগঞ্জ, দোয়ারাবাজার উপজেলায় ৫০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে।

অন্যদিকে জেলায় ১২৩৫ প্যাকেট শুকনা খাবার এবং ২০০ মেট্রিক টন চাল মজুদ রাখা হয়েছে। অপরদিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর জেলার সকল মসজিদে বিশেষ মোনাজাতের জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার অনুরোধ করেছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায় ২৪ ঘণ্টায় ১৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রের্কড করা হয়। জেলা প্রশাসক বলেন, পরিস্থিতি মোকাবেলায় সকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় খাবার পৌঁছে দেয়া হচ্ছে।

তাহিরপুরের ইউএনও আসিফ ইমতিয়াজ জানান, প্লাবিত গ্রামগুলোতে ত্রাণ দেয়া হচ্ছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।

তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুনা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, প্লাবিত সবগুলো গ্রাম সরজমিনে দেখেছি। মানুষ খুব কষ্টে আছে। উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে আমরা যথাসাধ্য সহযোগিতা করছি। দোয়ারাবাজারে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন ৫০টি গ্রামের লাখো মানুষ। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*