মনির উদ্দিন আহমদ সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ বিরোধী আপোষহীন নেতা



জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট এর সাধারণ সম্পাদক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ডাঃ এম. জাহাঙ্গীর হোসাইন বলেছেন, এদেশের মানুষের দুঃখ কষ্টের মূলকারণ সীমাহীন শোষণ ও বৈষম্যমূলক এক সমাজ ব্যবস্থা। যাকে লালন করেছে সা¤্রাজ্যবাদ এবং সামন্তবাদী ভূমি ব্যবস্থা এবং এর দোসর সামন্ত মুৎসুদ্দি শ্রেণি- এই উপলব্ধি থেকে ছাত্র জীবনেই এডভোকেট মনির উদ্দিন আহমদ রাজনীতির সংস্পশে আসেন এবং ১৯৪৩ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত কাছাড় জেলা মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ঐ সময় তিনি ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি সংস্পর্শে আসে এবং সা¤্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ উৎখাতের মধ্য দিয়েই এদেশের মানুষের মুক্তি আসবে বলে তিনি বিশ^াস করেন। সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট নয়া উপনিবেশিক ভারত পাকিস্তানে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি হলে তিনি দাঙ্গার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং সিলেট জেলা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরোধী শান্তি কমিটির সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সিলেট অঞ্চলে নানকার প্রথা বিরোধী আন্দোলন এবং সারা প্রদেশব্যাপী তেভাগা আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে ভূমিকা রাখেন।
১৯৫০ এর দশকে কমিউনিস্ট ভাব ধারার সংশ্লিষ্ট প্রগতিশীল ছাত্র-যুব নেতা কর্মীরা পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ গঠন করলে মনির উদ্দিন আহমদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং সিলেট জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন। ঐ সময় অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত গণতান্ত্রিক সংগঠন গণতন্ত্রী দল প্রতিষ্ঠিত হলে মনির উদ্দিন আহমদ গণতন্ত্রী দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং সিলেট জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৭ সালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত থাকেন এবং জেলা ন্যাপের প্রথম কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক, সভাপতি ও প্রাদেশিক কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
গত শতাব্দীর ৫০ এর দশকে বিশ^ কমিউনিস্ট আন্দোলনে স্টালিন এর মৃত্যুর পর সোভিয়েত রাশিয়ায় ক্রশ্চেভ চক্র ক্ষমতায় এসে ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান’ এর তত্ত্ব আমদানী করলে যে বিভ্রান্তি দেখা দেয় এবং বিতর্ক সৃষ্টি হয় আমাদের দেশেও তার ঢেউ এসে লাগে এবং এই তাত্ত্বিক বির্তকে মনির উদ্দিন আহমদরা ক্রশ্চেভীয় মতবাদকে সংশোধনবাদী আখ্যা দিয়ে বর্জন করেন এবং বিশ^ কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিভিন্ন সংশোধনবাদী ধারা যথা ‘তিনবিশ^ তত্ত্ব’ ইত্যাদির বিরুদ্ধে মতাদর্শিক সংগ্রাম পরিচালনা করেন এবং মার্কসবাদী লেলিনবাদী মতবাদকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেন।
মনির উদ্দিন আহমদ আইন পেশার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন শ্রমিক আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি লেবার ইউনিয়ন, সিলেট ইলেকট্রিক সাপ্লাই শ্রমিক ইউনিয়ন, আজিজ গ্লাস ফ্যাক্টরি শ্রমিক ইউনিয়ন প্রভৃতি সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত চা শ্রমিকদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে শ্রমিক জননেতা মফিজ আলীর সাথে ঐক্যবদ্ধ ভাবে ভূমিকা রাখেন এবং পূর্ব পাকিস্তান চা শ্রমিক সংঘ এর কোষাধ্যক্ষ ও আইন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সকল শ্রমিক সংগঠনকে একত্রিত করে আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে ঢাকায় অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় শ্রমিক সম্মেলনে অংশ গ্রহণ এবং সম্মেলনের আলোচনা সভা ও সাবজেক্ট কমিটির সভায় মনির উদ্দিন আহমদ সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক ফেডারেশন গঠিত হয়। তিনি সহ সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। বাংলাদেশ সৃষ্টির ৪৯ বছর পার হলেও কখনো রাষ্ট্রপতি শাসিত, কখনও সংসদীয় পদ্ধতি কখনও সেনা সরকার, কখনও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় শাসিত এদেশের জনগণ শোষণ, লুন্ঠন থেকে মুক্ত হয়নি। তাই আসুন প্রয়াত মনির উদ্দিন আহমদের আজীবন লালিত স্বপ্ন সা¤্রাজ্যবাদ সামন্তবাদ মুক্ত শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হই।
তিনি গত ১২ জুলাই শুক্রবার বিকালে সিলেট জেলা পরিষদ মিলনায়তনে এডভোকেট মনির উদ্দিন আহমদ এর শোকসভা কমিটি আয়োজিত শোক সভায় প্রধান আলোচকের বক্তব্যে উপরোক্ত কথাগুলো বলেন।
এডভোকেট মনির উদ্দিন আহমদ এর শোকসভা কমিটির আহবায়ক এডভোকেট কুমার চন্দ্র রায়ে সভাপতিত্বে এবং সদস্য ও জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট সিলেট জেলা শাখার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শাহীন আহমদের পরিচালনায় সা¤্রাজ্যবাদ সামন্তবাদ বিরোধী জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের অন্যতম নেতা, সিলেট ল’ কলেজ এর সাবেক অধ্যক্ষ ও সিলেট জেলার সাবেক পিপি, প্রবীণ রাজনীতিবিদ এডভোকেট মনির উদ্দিন আহমদ এর শোক সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান কবির, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতি কবি শহিদ ¯œাগনী, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক রজত বিশ^াস, বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতি সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি এডভোকেট নিরঞ্জন সরকার, গণতন্ত্রী পার্টি সিলেট জেলা সভাপতি মোঃ আরিফ মিয়া, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট জেলা শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট ই.ইউ শহিদুল ইসলাম শাহীন, প্রবীন রাজনীতিবিদ এডভোকেট গিয়াস উদ্দিন আহমদ, মনির উদ্দিন আহমদের চাচাতো ভাই রফিকুল হক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ সিলেট জেলার সাধারণ সম্পাদক মোঃ ছাদেক মিয়া, জাতীয় ছাত্রদল শাবি শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক দীনবন্ধু সরকার প্রমুখ।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*