সংকটের গণতন্ত্রে সংকটে গণমাধ্যম

সাইদুল ইসলামঃ আধুনিক শাসনব্যাবস্থায় গণতান্ত্রিক পদ্ধতি এখনকার সময়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সর্বজনস্বীকৃত একটি উত্তম পন্থা । জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা, জনগণের সরকারের রাষ্ট্র কাঠামোয় অন্যান্য বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রাষ্ট্রের গণমাধ্যম। আবার এই গণমাধ্যমের চরিত্র কেমন সেটার উপর নির্ভর করে সেই রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক। কারণ রাষ্ট্রীয় চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটে গণমাধ্যমের মধ্য দিয়ে। গণমাধ্যম হচ্ছে সমাজ বা রাষ্ট্রের দর্পন। যেখানে রাষ্ট্র চরিত্রের দেখা মিলে। এখানে দেখতে পাওয়া যায় রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গের নায়ক, মহানায়ক, খলনায়ক কিংবা পার্শ্বঅভিনেতাদের ভূমিকা। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চারটি মূলনীতির অন্যতম মূলনীতি ও মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য “গণতন্ত্র” ৭১ পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে বার বার হোচঁট খেয়েছে। এই হোচঁট যেমন খেয়েছে জোর করে ক্ষমতা দখলকারী স্বৈরশাসকদের হাতে, তেমনি খেয়েছে জনগণের ভোটে নির্বাচিত দলীয় সরকারদের হাতেও। তবে দুটোর প্রক্রিয়া ভিন্ন। ৭০ এর নির্বাচন, তৎপরবর্তী পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা হস্তান্তরের নামে টাল বাহানা, মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি, মুক্তিযুদ্ধের সময় কিংবা তৎপরবর্তীকালে যেকোন দুঃসময়ে দেশের আপামর জনসাধারণের হয়ে সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যম যেভাবে দেশের তরে ভূমিকা রেখেছে, এখন আর সে ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা যায় না গণমাধ্যমকে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তৎকালীন সংবাদ পত্র দৈনিক ইত্তেফাক ও সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র যে ভূমিকা রেখেছিল আজ একই ইত্তেফাক ও

অপরাপর সংবাদমাধ্যমগুলো তার আগের অবস্থানে নেই। কারণ বর্তমান বাংলাদেশের সংকটাপন্ন গণতন্ত্রের মত গণমাধ্যমও সংকটে পতিত। এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে দু’দিক থেকে। গনতন্ত্রকে সংকটে ফেলতে যারা ভূমিকা পালন করেছে, গণমাধ্যমের কল্যানে গনতন্ত্র যাতে ট্রাকে না ফিরতে পারে, তারাই চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে গনমাধ্যমকে সংকটে রেখেছে। যদিও অনেক গণমাধ্যমের জন্ম তাদের হাতেই। অন্যদিকে দলদাস সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যম অতিমাত্রায় সরকারের দিকে ঝুঁকে পড়ার কারনেও সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দুর্ভাগ্য যে, গণমাধ্যমের হর্তাকর্তারা ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক কিংবা চাপে পড়ে হোক এই সংকটকে মেনে নিয়েই বেঁচে থাকার জন্য বেঁচে আছে।

কিন্তু সরকার যা-ই করুক না কেন, গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে সরকারের চাপের কাছে মাথা নত করেছেন সাংবাদিক সমাজ ও সংবাদ মাধ্যমের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যাক্তিরা। তিনিরা সরকারের এহেন অনৈতিক চাপে প্রতিবাদী না হয়ে দাসত্বকে মেনে নিচ্ছেন। যে দেশের সাংবাদিক পাক হানাদারদের বন্দুকের নলের মুখেও সত্য প্রকাশে পিছপা হননি, সে দেশের সাংবাদিক আজ ডিজিএফআইয়ের ভয়ে কাতর। যে সম্পাদক নিজ হাতে রাজাকারের তালিকায় নিজের বাবার নাম লিখে সৎ সাহসিকতা ও নীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, সেই সম্পাদক আজ সরকারের অপকর্মের পক্ষে ইনিয়ে বিনিয়ে টকশোতে কথা বলেন। আজ সকল সংবাদ মাধ্যমে অলিখিত সেল্ফ সেন্সরশিপ চলছে। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো আজ ক্ষমতাহীনদের ফাঁস করা ফোনালাপ যতটা উৎসাহ নিয়ে প্রচার করে, ক্ষমতাসীনদের বেলায় ততটা নীরব।
রুগ্ন গণতন্ত্র ও সংকটাপন্ন গণমাধ্যমের ব্যাপ্তি ঘটেছে শক্তিশালী বিরোধীদলের অভাবে। মাঠে ও পার্লামেন্টে কার্যকর বিরোধীদল না থাকায় গণমাধ্যমের উপর আসা চাপ এককভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব হয়নি। বরং গণমাধ্যমের সংকট আরো বেগবান হয়েছে। অন্যান্য পেশাজীবির মত রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিতার জন্য মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো পাঠকের আস্থার সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু সংবাদমাধ্যম তো রীতিমতো রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে মাঠে নেমেছে। সাথে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের চ্যালেঞ্জ। সব মিলিয়ে আজ গণতন্ত্রের জীর্নতার মত গণমাধ্যমকে শীর্নতা কাবু করেছে। এ থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজে বের করতে হবে। দেশের স্বার্থেই এগিয়ে আসতে হবে জাতির বিবেক খ্যাত কলম সৈনিকদের। লেখক যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাংবাদিক
Syd903@yahoo.com

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*