একতরফা প্রদানকৃত শশুরবাড়ির ইফতারি/আমকাঠাঁলিকে না বলুন

মোঃ বাদশা মিয়া: আজকে আমার পরিচিত একজনকে ফোনে অন্য আরেকজনকে বলতে শুনলাম, মাস খানেক আগে বিয়ে হওয়া বোনের বাড়িতে আসন্ন রামদ্বান উপলক্ষে কি পরিমাণ ইফতারি দেয়া লাগবে? তা জানার জন্য বোনের শশুর বাড়িতে কল করে জিজ্ঞেস করেছেন!

বাংলা গ্রীষ্ম মৌসুম চলমান। এবং একদিন পরেই শুরু হবে মুসলিম উম্মাহর জন্য সবচেয়ে পবিত্র আরবি মাস রামদ্বানুল মোবারক।
আর এই গ্রীষ্ম মৌসুম ও রামদ্বান মাস কে উপলক্ষ করে বৃহত্তর সিলেটে (অন্য জায়গা সম্পর্কে আমার ধারণা খুবই নগন্য। তবে অন্য জায়গায় সিলেটের মতো জোড়ালো না এসব প্রথা এটা নিশ্চিত) একটি প্রথা বর্তমানে জঘন্য রূপ লাভ করেছে!
আর তা হলো বিবাহিত দম্পতিকে কেন্দ্র করে মেয়ে পক্ষ ছেলে পক্ষের বাড়িতে গ্রীষ্ম মৌসুমে আম কাঠাল আর রামাদ্বান মাসে ইফতারি পাঠানো।
দেখা বা জানা মতে এই প্রথা কে এমন ভাবে পালন করা হয় যেন মেয়ের বাড়ি কর্তৃক ছেলের বাড়িতে আমকাঠাঁল বা ইফতারি না পাঠানো গর্হিত অপরাধ।
একটু লক্ষ করলেই সমাজের নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন শ্রেণির (এখানে নিম্ন শ্রেণী বলতে দিন আনে দিন খায় পরিবারকে বোঝানো হয়েছে) পরিবারে এই প্রথার কুফল বেশি দেখতে পাওয়া যায় বা যাবে। এইসব পরিবারের একজন বধুকে কি পরিমাণ মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে হয় এই সকল প্রথার জন্য, তা হয়তো এই সব প্রথাবাদীর দৃষ্টিগোচর হবে না!
বিশেষ করে যারা গ্রামীণ সমাজের মানুষ রয়েছেন। তারা এই প্রথার কারণে বেশি ভুক্তভোগী হতে দেখা যায়। রামদ্বান আসার কিছুদিন পূর্ব থেকেই মেয়ের শশুর বাড়ির লোকজন বিশেষ করে ননদী, দেবর, দেবর বা ভাসুরের বউ, শাশুড়ি এমনকি স্বামীও বিভিন্ন ভাবে মেয়েকে বলতে থাকে এইবার তোমার বাপের বাড়ি থেকে কেমন বড় ইফতারি বা আমকাঁঠাল আসবে দেখা যাবে? প্রথমদিন তোমার বাপের বাড়ি থেকে ইফতার আসবে না? রামদ্বান উপলক্ষ্যে এইবার অনেক বড় ইফতার পার্টি দিতে হবে, তোমার বাপ-ভাইকে বল একটু বেশি করে ইফতারি দিতে? গতবার তো অনেক কম দিয়েছিলেন, আমার একটা মান সম্মান আছে এলাকায় ইত্যাদি ইত্যাদি বিভিন্ন বাক্য। আর এসব শোনে গরীর কৃষকের অথবা দিন মজুরের মেয়ে বা বোন বাপের বাড়িতে ফোন দিয়ে কথাগুলো বলতে বাধ্য হয় এবং হতদরিদ্র বাবা বা ভাই তাদের মেয়ে বা বোনের বাড়িতে ইফতারি বা আমকাঠাল পাঠাতে হবে বলে আগে থেকেই টাকা জমাতে শুরু করে। এমন অনেকেই আছে নিজের গোয়ালের গরু, ছাগল, মহিষ বিক্রি করে মেয়ে বা বোনের বাড়িতে ইফতারি বা আমকাঠাল পাঠান।
তবে যারা বিত্তশালী তারা নিজে থেকেই মেয়ের বাড়িতে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করেন কি পরিমাণ ইফতারি বা আম কাঁঠাল দিলে ওনাদের কম হবে না। রীতিমতো প্রতিযোগিতায় করে ইফতারি বা আম কাঁঠাল দেয়া বা নেয়া হয়। আর চলমান এই প্রচলন কে অনুসরণ করতে গিয়ে নির্মমতায় পৃষ্ঠ হয় সমাজের অপেক্ষাকৃত গরীব ও দিন আনে দিন খায় মানুষগুলো।
শারীরিক নির্যাতনের চেয়েও জঘন্য এইসকল মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অনেক পরিবার ভেঙে গেছে অথবা অনেকেই আত্মহত্যা করেছে! যা হয়তো আমাদের জানার বাহিরে থাকে বা জেনেও চুপ থাকি।

আমার আশপাশের অনেকের কাছেই এই সকল প্রথা সম্পর্কে তাদের অভিমত জানতে চাই। কিছু সংখ্যক সচেতনতার সহিত এই সকল প্রথা বন্ধ হওয়া জরুরি বলে মত প্রকাশ করেন। আর বেশিরভাগই যুক্তি ধার করান যে, এই সকল প্রথা আছে বলেই আমাদের আত্মীয়তার বন্ধন এখনো মজবুদ আছে। যা নাকি দেশের অন্যান্য স্থানের তুলনায় ভাল।
আমি ওনাদের এই যুক্তির বিরোধীতা না করে প্রশ্ন রাখি আত্নীয়তার বন্ধন মজবুদ রাখার কর্তব্য কি এক পক্ষের উপর বর্তায়?
কেন শুধু এক পক্ষ দিয়ে যাবে আর আরেক পক্ষ গলাধঃকরণ করবে?
যদি এর মাধ্যমে আসলেই আত্মীয়তার বন্ধন মজবুদ হয় তাহলে কেন উভয় পক্ষ কর্তৃক পালন করা হয় না?
আশানুরূপ জবাব না পেলেও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন এই প্রথার জগন্য কুফল রয়েছে আমাদের সমাজে।
হে স্বীকার করছি এই প্রথার মাধ্যমে পারিবারিক মিলনব্যবস্থা কিছুটা শক্ত হয় বা হয়ে আসছে! তবে যদি এই প্রথা আপনি পালন করতেই হয় তাহলে উভয় পক্ষ কর্তৃক পালন করছেন না কেন?
আপনি আপনার ঘর থেকে আন্দোলন শুরু করুন এই প্রথাকে সার্বজনীনতা থেকে বের করে আনতে । আপনি বা আপনার ভাই বিয়ে করলে তাকেও বলুন শশুর বাড়িতে আমকাঠাঁল বা ইফতারি নিয়ে যেতে।
এতে করে একটা প্রচলন শুরু হবে। আর এর মধ্য দিয়ে যেসব পরিবার এসব প্রথা অপারগ হয়ে পালন করে তারা তা বর্জন করতে শুরু করবে। যখন দেখবে উভয়কেই এই প্রথার কুফল ভোগ করতে হচ্ছে। কারণ আমরা মানব প্রাণী নিজের উপর কিছু না পড়লে সেটার সুফল-কুফল বুঝতে পারি না বা বুঝতে চেষ্টা করি না!
এইসকল প্রথার কারণে যেন আর কোন মেয়ে তার শশুর বাড়ির মানুষের দ্বারা মানুষিক নির্যাতনের স্বীকার না হয় তার বিরোদ্ধে সোচ্চার হতে হবে আপনি, আমি এবং আমরা সবাই।
আপনি আপনার ঘর থেকে শুরু করুন(হয়তো ব্যর্থ হবেন তবে বুঝাতে চেষ্টা করুন এই প্রথার কুফলগুলো! একসময় সফল হবেন) কারণ আপনার বদলের মধ্য দিয়েই আপনার চারপাশ বদলাতে বাধ্য।

শুধুমাত্র আত্নীয়তার বন্ধনের দোহাই দিয়ে এই প্রথাকে সমাজে আরো প্রতিষ্ঠিত করতে এর পক্ষ নিবেন না। হয় উভয় পক্ষ কর্তৃক পালন করুন, নয় এই জঘন্য প্রথাকে না বলুন। মানুষের পাশাপাশি মানবিক হতে চেষ্টা করুন।

লেখক : সাবেক শিক্ষার্থী (নৃবিজ্ঞান বিভাগ), শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*