কাকের ভাষা (সত্য কাহিনী- অবলম্বনে)

জান্নাতুল শুভ্রা মনি :

বিকাল বেলায় ছাদে উঠা আমার নিত্য দিনের অভ্যাস। ঐ সময় ঘুমও আসেনা। বিকেলের নীরবতার মধ্যে অন্যরকমের গা মেজ মেজ করা অনুভূতি কাজ করে। ঐ সময় টাতে মনে মনে বান্ধবী সালমার জন্য ওয়েট করি,কারণ সে কোচিং শেষ করে প্রায় প্রতিদিনই আসে বাসায় এবং দুজন মিলে দারুন আড্ডা হয় সন্ধ্যা নাগাদ। আজ ও আসছে না। বার বার পায়চারী করছি ছাদে। অন্যদিন নীচের বস্তির পিচ্চি বাহিনী গুলোরে নিয়ে ছাদে আড্ডা দেই। আজ একটারেও দেখা যাচ্ছে না! খুব বিরক্ত লাগছে! মনে মনে ভাবি,কেমনে যে মানুষ একলা থাকে উফ! অসহ্য। আজকের বিকেলটা এতোটাই নীরব! কোনও গাড়ি রিক্সারও শব্দ পাচ্ছি না। হঠাৎ খুব বেশি উদাস হয়ে গেলাম। বিষন্ন দৃষ্টিতে ছাদের পাশের কদম ফুলগুলো দেখতে লাগলাম। পুরো গাছ জুড়ে কদম ফুল! মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইলাম।হাত বাড়ালেও ধরতে পারব না। … আমি খুব বেশি একা ফীল করছি! মনে হলো এই মুহূর্তে একটা পাখিও যদি আসত তাহলে পাখিটার সাথে কথা বলে সময় কাটাতে পারতাম। … চিন্তা শেষ হতে না হতেই এক জোড়া কাক এসে বসল কদম গাছের ডালে। আমি চেয়ে রইলাম তাদের দিকে। এক টা কাক আরেকটা কাকের দিকে চেয়ে আছে মুগ্ধ হয়ে।কি কি কথা বলছে আর হেসে কুটি কুটি দুজনেই। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি কাকের ভাষা। একটা ছেলে কাক এবং আরেকটা মেয়ে কাক। দুজন দুজনকে ভালোবাসে খুব। তারা খুব সুখি দেখে মনে হলো। গৌরগবিন্দ টিলার ওখানে হয়ত তাদের বাসা। কারণ,অসংখ্য কাক সেখান থেকে বের হয়।তাদের কে ও ওখান থেকে ছুটে আসতে দেখেছি। কি জানি,দুজন লুকিয়ে ঘুরতে বের হইছে মনে হয়। আমি মুগ্ধ হয়ে তাদের কথা শুনছি আর দেখছি। হঠাৎ দেখলাম ছেলে কাক টা মেয়ে কাক টাকে বিস্কিট খাওয়াচ্ছে। তারা সোজা ছাদে এসে বসল। তাদের ভালোবাসা দেখে অনেক মুগ্ধ আমি। .. কিছুক্ষণের মধ্যে হঠাৎ আরেকটা মেয়ে কাক এসে হাজির। মেয়ে কাক টা ইনিয়ে বিনিয়ে ছেলে কাকটা কে ডাকছে। ছেলে কাক টা মুহূর্তেই তার কাক বান্ধবীরে রেখে ছুটে গেলো নতুন মেয়ে কাকের পাশে বিস্কিট সহ। .. এদিকে-তার কাক বান্ধবী প্রচন্ড কর্কশ স্বরে তার কাক বন্ধুকে ডাকছে… কাঁ! …কাঁ!…কাঁ!!! .. কিন্তু ছেলে কাকের কানেই যাচ্ছে না। সে নতুন মেয়ে কাক রে নিয়ে মহা ব্যস্ত! মুহুর্তেই তার বান্ধবীরে ভুলে গেছে! আর তার বান্ধবী প্রাণ ফাটা চিৎকার করে তারে ডাকছে! আহা! দেখে আমার প্রচন্ড মায়া হলো কাক বান্ধবীর জন্য! কষ্ট হলো খুব। রাগ হচ্ছে ছেলে কাকের উপর! চেয়ে দেখি সে নতুন মেয়ে কাকরে মুখে তুলে বিস্কিট খাওয়াচ্ছে। … এদিকে কাকের বান্ধবী গলা ফাটা চিৎকার করে কাঁদছে! এক সময় সে চলে যাবার জন্য পা বাড়ালো, ঘাড় ফিরিয়ে ছেলে কাকটারে বলল,আমি চলে যাচ্ছি,আমারে আর পাবা না।এতদিন ধরে তোমাকে ভালোবাসছি কিন্তু নতুন অচেনা মেয়ে কাকের ডাকে আমাকে মুহূর্তেই

ভুলে গিয়ে ছুটে গেলে তার কাছে। তুমি ভেবেছো সে তোমাকে ভালোবাসে? মোটেও না, সে তোমার জন্য আসেনি। এসেছে তোমার হাতের বিস্কিট এর জন্য। দেইখো,তোমার হাতের বিস্কিট যখন শেষ হবে তোমার নতুন কাক বান্ধবীও সাথে সাথে উড়ে চলে যাবে তোমাকে ছেড়ে। আমি চলে যাচ্ছি ,হয়ত আর কখনও আমাকে পাবেনা, বলেই সে উড়াল দিলো! … এদিকে ছেলে কাক তাকিয়ে দেখে তার বান্ধবী চলে যাচ্ছে।সে মোটেও পাত্তা দিলো না। সে তার নতুন বান্ধবীরে নিয়ে মেতে আছে।বিস্কিট খাওয়াচ্ছে বার বার। যখন কিছুক্ষণ এর মধ্যেই বিস্কিট পুরোটা শেষ সাথে সাথে তার নতুন বান্ধবী তাকে রেখে উড়াল দিলো! ছেলে কাক তা দেখে হতভম্ব! বিশ্বাসই হচ্ছে না! নতুন মেয়ে কাক এমন করবে! সেও পিছন পিছন গেলো কিন্তু নতুন মেয়ে কাক টা তাকে কর্কশ ভাষায় বকতে লাগল! ছেলে কাক অসহায় ফীল করছে! কি করবে! কি করবে!.কেন এমন করলো তার বান্ধবীর সাথে?হায় হায় কি করি! ভাবতে ভাবতে ছুটে গেলো তার বান্ধবী যে দিকে গেছে সে দিকে। প্রচন্ড কর্কশ ভাবে নাম ধরে বান্ধবীরে ডাকছে! কই তুমি??? কই??? আমি এসেছি! আমি সরি! আমি ভুল করেছি! তোমাকে রেখে চলে যাওয়া আমার উচিত হয়নি! ছেলে কাক এক বার ডানে একবার বামে যাচ্ছে একবার নীচে একবার উপরে উড়ছে আর খুজে ফিরছি বান্ধবীরে!!!
কিন্তু-কোথাও পেলো না! অবশেষে আস্তে আস্তে উড়ে এসে আমার ছাদে বসল! বিমর্ষ ভঙ্গিতে অপরাধী মুখ করে কাতর হয়ে তাকালো আমার দিকে… বলল -কা! কা! কা! সরি! সরি! সরি!

লেখক: কবি,ছড়াকার, সাংবাদিক ও এপ্রেন্টিস ল ইয়ার,সিলেট জজ কোর্ট।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*