পিতার স্বীকৃতির জন্য কন্যার আকুতি!

জান্নাতুল শুভ্রা মনি :

(১) যুদ্ধ করে পৃথিবীতে স্বাধীন হয়েছে কয়টা দেশ? সংখ্যাটা বেশি নয় মোটেও। তবে এর একটি যখন বাংলাদেশ, তখন বিশ্বের বুকে এ দেশটি কেন আলাদা হবে, কেন বীরের এলাকা বলে এর পরিচিতি হবে না, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। সম্প্রতি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪৭তম বার্ষিকী উদযাপন করছে দেশের আপামর জনতা। এতোগুলো বছর ধরে হৈ-হুল্লোরে গোটা বাঙ্গালি জাতি উদযাপন করে আসছে দিনটি মনের আনন্দে। কিন্তু আমি আনন্দিত হতে পারিনি একটা মুহূর্তের জন্যও। তীব্র চাপা কষ্ট প্রতিনিয়ত আমাকে আহত করে,কাঁদায়! আর্তনাদ করে ডুকরে কাঁদি এই দিনটি আসলেই। অতৃপ্তি বাসা বাধে স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতির কারনে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত মর্যাদা দেয়া হয়নি বলে। ভুলতে পারিনা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার বাবার অবদান,ভুলতে পারিনা, মানতে পারিনা কিছুতেই মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতিটুকু না পেয়েই তিনি চলে গেলেন চিরতরে। আমার বাবার আত্মা এখনও অতৃপ্ত সেই সাথে আমারও। কারন আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার কন্যা হয়েও শুধু মাত্র সঠিক মূল্যায়ন না করার জন্য মুক্তিযোদ্ধার কন্যা নামক গৌরবময় উপাধিটিকে মাথার মুকুট হিসেবে ব্যবহার করতে পারি না। কয়েকদিন আগেই উদযাপন করলাম মহান বিজয় দিবস। বিজয়ের ভোরে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শুরু করেছিলাম পবিত্র এ দিনটি। আজন্ম এভাবেই পালন করছি শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস, শহীদ দিবস এবং বিজয় দিবস। বাবার জীবদ্দশায় তার হাত ধরে মধ্যরাতেও শহীদমিনারে ফুল দিতে যাওয়া হতো। এভাবেই ধমনীতে, মিশে আছে শহীদমিনার আর শহীদ স্মৃতির প্রতি দায়িত্বশীলতা। আর তাই আজ আমি আমার বাবাকে নিয়ে কিছু কথা সবার সামনে তুলে ধরতে চাই।

স্বাধীনতার ৪৭ বছর পার হয়ে গেলো, পার হয়ে হয়ে গেলো বাবার মৃত্যুর ১৭টি বছর। পান নি আজও কোনও স্বীকৃতি রাষ্ট্রের কাছ থেকে। জীবন বাজী রেখে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধে গিয়েছিল দেশকে স্বাধীন করার জন্য। কোনও স্বীকৃতির জন্য যান নি। আমার বাবা একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কিন্তু আজ আমাকে প্রশ্নের সম্মূখীন হতে হচ্ছে তিনি আদৌ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কি না! কারন, তাঁর কোন ডকুমেন্ট বর্তমানে আমাদের কাছে নাই। যা ছিল ১৯৮৮সালের ভয়াবহ বন্যার পানিতে তলিয়ে যায় সব কিছু। আমার বাবা ছিলেন আত্মপ্রচার বিমূখ মানুষ। তিনি মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের কর্মকান্ডের সাথে জড়িত ছিলেন। কখনো এসবের স্বীকৃতি চান নি। আজ যখন এমন প্রশ্নের সম্মূখীন হতে হয়েছে আমার মৃত বাবাকে, মুক্তিযোদ্ধা হয়েও চাঁপা পড়ে যায় তার নামটি,অস্বীকৃতি জানায় যখন এলাকার মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাচাইর কমান্ডার, এসব দেখেও যখন প্রতিবাদহীন নির্বাক নিশ্চুপ আমার বাবা বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে বার বার ডুকরে কেঁদে কেঁদে বলতেন অভিমান নিয়ে,কেন যে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম! তাহলে আজ দেখতে হতো না,সহ্য করতেও হতো না,যারা ছিল রাজাকার আজ তারাই স্বাধীন পতাকা উত্তোলন করে প্রধাণ অতিথির আসন দখল করে! সবাই বাহ বাহ হাততালিতে মূখোর হয়ে উঠে! আর যারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তারা ঠিক আমার মতোই শয্যাশায়ী! এমন আক্ষেপ নিয়ে আমার বাবা শেষ নিঃশ্বাসটাও ত্যাগ করেন, কিন্তু হয় নি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন!

(২) সেই আক্ষেপ,অসহ্য চাপা যন্ত্রণা, প্রচন্ড ক্ষোভ, সীমাহীন জেদ আমার ভেতরে কাজ করতে থাকে যখন আস্তে আস্তে এই বোধ শক্তিটুকু তৈরি হতে থাকলো আমার ভেতরে। তাই তার কন্যা হিসেবে আমি চুপ থাকতে পারিনি। কারন,এটা আমার বাবার ন্যায্য অধিকার এবং কন্যা হিসেবে তা প্রমান করা আমার দায়িত্ব। আমি তাই,আমার বাবাকে নিয়ে লিখা শুরু করলাম তাঁর মুক্তিযুদ্ধের কর্মকান্ড নিয়ে২০০৬ সাল থেকে।বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা প্রকাশ হতে থাকলো,তখন আমি স্কুলে পড়ি ক্লাস এইট এ।এভাবে লিখতে লিখতে ২০১৬র দিকে একটা পর্যায়ে এগিয়ে আসলেন সিলেটের ডাকের সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার সাঈদ নোমান। এ ব্যাপারে সাহায্য করলেন আমাকে। আমাকে মুক্তিযুদ্ধের উপর অসংখ্য বই দিলেন জসিম বুক হাউস। আমি মুক্তিযুদ্ধেরর উপর অসংখ্য বই পড়তে লাগলাম। মাসুম আহমেদ এবং কে এইচ মামুন ভাইও সাহায্য করেছেন আমাকে। সিলেট থেকে আমাকে পাঠানো হলো আমার এলাকার উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার “আতাউর রহমানের “কাছে। আমি জানতে চাইলাম মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন লিস্টে কি আমার বাবার নাম এসেছে কি না? তিনি এটা শোনা মাত্রই রূঢ় ব্যবহার করলেন আমার সাথে।স্পষ্ট করে বলে দিলেন, আমার বাবা কোন কালেই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। উত্তরে আমি বললাম বিনীত ভাবে-আমার বাবা যদি মুক্তিযোদ্ধা না হতেন, তাহলে বইয়ের মধ্যে নাম আসলো কি করে? উনি তখন টিটকারি সুলভ আচরণ করলেন আমার সাথে। কোন রকম সাহায্য তো দূরের কথা উল্টো আমি মেয়ে বলে ক্রিটিসাইজ করছিলেন। উনার সাথে চামচা গোছের যারা ছিল তারাও ক্রিটিসাইজ করছিল। আমি অসহায় বোধ করছিলাম তখন। অসহায় বোধ করছিলাম একারনেই,কারন একজন মুক্তিযোদ্ধার আচরণ এতোটা নিকৃষ্ট হতে পারে ভেবে। অথচ-এরাই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম লিস্টেড করেন। এরকম মুক্তিযোদ্ধার কমান্ডারদের কারনে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বার বার। আমি হতাশ হইনি মোটেও।বরঞ্চ আর ও উদ্যম সাহস শক্তি সঞ্চয় করে এগিয়ে যাই। প্রচন্ড জেদ চাপে মনে। আমার বাবা মুক্তি যোদ্ধা ছিলেন এটা আমি প্রমান করব যে ভাবেই হোক। সত্যের জয় হবে এটাই বাস্তব। অবশেষে-মুক্তিযোদ্ধের অসংখ্য বইয়ের মধ্যে একটা বই পেয়ে যাই। বইটির নাম রক্তাক্ত একাত্তর,বইটি লিখেছেন সুনামগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের গবেষক সুনামগঞ্জ বারের সাবেক সভাপতি বজলুল মজিদ খসরু। বইটাতে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমার বাবার কথা লিখা আছে। যখন দেখলাম আমার বাবার কথা লিখা আছে,আমি তো আবেগে আপ্লুত হয়ে চিৎকার করে কেঁদে ফেলি! আমার এতোদিনের চাওয়া আজ আলোর মুখ দেখতে পেয়েছে! আমার এতোদিনের সাধনা,বাবার অতৃপ্ত আত্মা আজ একটু হলেও শান্তির আস্বাদন খঁজে পাবে! আমার উৎসাহ উদ্দীপনা,আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেলো কয়েকশ গুন! এতোদিন অন্ধকারে হাতড়িয়ে বেড়িয়েছি স্মৃতিচারণ এর উপর,আজ আলোর প্রতিবিম্ব দেখতে পেলাম। সবচেয়ে বড় যে হাতিয়ার ” লিখিত ডকুমেন্ট আস্ত একটা বই” পেয়ে গেলাম। সত্যি তাহলে আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন? কারণ এতোগুলো বছর মিথ্যা শুনতে শুনতে নিজের মনটাও ওদের মতো বলছিল সত্যি কি আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা? তবে হ্যা! বিশ্বাস করতাম করেছি প্রবল ভাবে,কারণ বাবা কখনও মিথ্যা বলতেন না ছোট বেলা থেকেই দেখেছি। যাক, বজলুলু মজিদ খসরু যিনি বইটি লিখেছেন,উনার সাথে সরাসরি দেখা করি এবং কথা বলি। কথা বলার পর জানতে পারলাম আমার বাবা ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। শুধু তাই নয়,এতোটা কাল ধরে যা আমরাও জানতে পারিনি কখনও, সব জানতে পারলাম উনার মুখ থেকে। চারপাশে অসংখ্য আইনজীবীরা ছিলেন,তারাও শুনছে কথাগুলো,আমি গর্বে ফেটে পড়ি! এতো যোগ্যতাসম্পন্ন গুনের অধিকারী ছিলেন আমার বাবা! সামান্য তম স্বীকৃতিটুকুও না পেয়ে চলে যেতে হলো তাঁকে! আমি আরও লিখতে শুরু করে দিলাম বাবার মুক্তিযোদ্ধার ডকুমেন্ট নিয়ে। . একটা সময় এমন হলো কিছু ব্যক্তি নিজ থেকে এগিয়ে আসলো আমাকে সাহায্য সহযোগিতা করার জন্য এই বিষয়ে। বুঝতে পারলাম তারা ডকুমেন্ট এর উছিলায় আমার সাথে পরিচিত হতে বেশি আগ্রহী! ওদের কে কোনও রকম পাত্তা না,দিয়ে নিজেই লিখতে শুরু করলাম। নানান জায়গায় যাবার সময় আমার ছোট ভাই শাহরিয়ার থাকতো আমার সাথে,আমাকে সব সময় সহযোগিতা করেছে। বিভিন্ন বইয়ের মধ্যে আমার বাবার নাম টা পেয়েছি, এখন সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো-মুক্তিবার্তায় আমার বাবার কোন নাম নাই। আমি কিভাবে এখন অগ্রসর হবো। বাবার সাথে সহযোদ্ধা যারা ছিলেন,কেউ আজ জীবিত নেই। একমাত্র বজলুল মজিদ খসরু মৌখিক ভাবে সাক্ষী দিতে পারবেন। আমার বাবা ছিলেন আত্মপ্রচার বিমূখ মানুষ। তিনি মুক্তি যুদ্ধে গিয়েছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধ কর্মকান্ডের সাথে জড়িত ছিলেন। কখনো এসবের স্বীকৃতি চান নি। কোনো কিছু পাওয়া-না পাওয়ার হিসাব করে নয়, দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সম্মুখ সমরে। ছিনিয়ে এনেছিলেন স্বাধীনতার লাল সূর্য, একটি পতাকা, একটি মানচিত্র। স্বাধীন বাংলার মানচিত্রের জন্য নিজের জীবনের তোয়াক্কা করেননি আমার বাবা। অথচ স্বাধীনতার ৪৭বছর পেরিয়ে গেলেও তিনি পাননি কোন স্বীকৃতি।

আমার বাবার উপর আমার প্রচন্ড অভিমান হয়! সেই সাথে প্রচন্ড রাগ !! তার এক মাত্র কারণ -তিনি ছিলেন স্বল্প ভাষী আর আত্মপ্রচার বিমূখ লোভ লালসাহীন একজন মানুষ!!! গর্ববোধে ফেটে পড়ি কারণ আমার বাবা ছিলেন একজন প্রথম শ্রেনীর মুক্তিযোদ্ধা! ইতি পূর্বে আমি অসংখ্য বার আমার বাবা কে নিয়ে লিখে এসেছি সেই ২০০৬ সাল থেকে যখন আমি স্কুলে পড়ি তখন থেকে! ঐ সময়ে আমি শুধু এটাই জানতাম, আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন! কিন্তু অত্যান্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাবার রেখে যাওয়া কোনও রকম ডকুমেন্ট ছিল না! যা ছিল তার সবই ৮৮ সালের বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে তলিয়ে গেছে! পরে যা ছিল তাও কোনও না কোনও ভাবে হারিয়ে গেছে! জীবিত থাকা অবস্থায় কখনওই দেখি নাই নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবী করতে বা জাহির করতে এবং করেনও নাই! যতোদিন বেচে ছিলেন ততদিন রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থেকে গেছেন! এক সময় এ্যাক্সিডেন্ট করেন,তাও ছিল বন্ধুর কাজে ঢাকা যাবার পথে! অবশ্য সেই বন্ধু আর একবারও খোঁজ নেন নি আব্বার!তারপর অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন, অতঃপর মৃত্যু! কিন্তু হয়নি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন কেবল মাত্র একটি নামধারী সার্টিফিকেট এর জন্য! এলাকার গজিয়ে উঠা চিনে পুঠিদের হাতে গিয়ে দায়িত্ব পড়ে এই মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট প্রদান করার! পলিটিক্যাল ভাবে বিরোধী দলীয় ছিলেন বলেই সরকারী দলের মুক্তিযোদ্ধার কমান্ডাররা অস্বীকৃতি জানায় আমার বাবা কোনও কালেই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না! তাঁর কন্যা হিসেবে আমাকে টিজ করে, ব্যাঙ্গাত্মক ভাবে! আমি আইন নিয়ে পড়াশোনা করছি বলে,আমার বাবার ডকুমেন্ট এর বিষয়ে কথা বলছি বলে চেলা পেলা নিয়ে ক্রিটিসাইজ করতে ছাড়ে নি! হ্যাঁ! শুনেছি উনিও মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধার কমান্ডার! আর কোনও রকম ডকুমেন্ট হীন ব্যক্তি আত্মপ্রচার বিমূখ ব্যক্তি আব্দুল গণি,আমার বাবা -তিনিও মুক্তিযোদ্ধা! জীবিত থাকা কালীন সময়ে আমার বাবা শুধু ডুকরে কেঁদেছেন মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট এর জন্য নয়, ডুকরে কেঁদেছেন স্বাধীন দেশটা কোনও ভাবে যেনো রাজাকার, আলবদর, আলশামস,কোনও মীরজাফর দের হাতে চলে না যায় এই আশংকায়!

যখন আমি উপলব্দি করলাম মুক্তিযোদ্ধা কি? আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা! অথচ মৃত্যুকালে হয়নি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন! সেই উপলব্ধি,সেই না মেনে নেয়ার তীব্র কষ্ট আমাকে প্রতি নিয়ত আঘাত করত তীব্র ভাবে! অন্ধকারে হাতড়ানোর মতোই আমি শুধু মাত্র কলম হাতে নিয়ে হাতড়াতে লাগলাম! লেখতে শুরু করে দিলাম আমার বাবাকে নিয়ে! একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়েও কিভাবে তাঁর নামটি চাপা পড়ে গেলো! এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা কিছু সংখ্যক অস্বীকৃতি জানালো! প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়ে কেন তিনি তাঁর অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন??? টানা লিখে গেছি বিভিন্ন পত্র পত্রিকায়! বাবা করেছিলেন দেশের জন্য যুদ্ধ আর কন্যা হয়ে আমি নেমে পড়লাম মুক্তিযোদ্ধার প্রকৃত অধিকার আদায়ের যুদ্ধে! এখানেও আলবদর, আলশামস দের আনাগোনা দেখেছি! এক পর্যায়ে নোমান ভাই আমাকে সাহায্য করেন, (রক্তাক্ত একাত্তর সুনামগঞ্জ, বইটির কথা বলেনএবং লেখক বজলুল মজিদ খসরু আংকেল এর সাথে দেখা করিয়ে দেবার ব্যবস্থা করে দেন। জসিম বুক হাউস বইটি আমাকে দিয়ে কৃতার্থ করেন! তখন এক এক করে সবার সাথে আমার দেখা হয়,কথাও হয় এবং আমার বাবার সহযোদ্ধা যিনি তাঁর সাথেও কথা হয়। তখনই জানতে পারি এক এক করে সব! যা এতোকাল কিছুই জানা হয়নি! বাবা কখনও নিজের মুখে নিজের গুনকীর্তন গাইতেন না, তাই সব চাপা পড়ে রয়! সবচেয়ে কষ্টের কথা বাবার নিজের ভাই বোনেরাও বলতেন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না,যদি হতেন তাহলে কেন টাকার গদিতে ঘুমাননি? কই আরও মুক্তি যোদ্ধা যারা তারা তো সবাই কোটিপতি! যাক- সেই দিনই জানতে পারলাম বজলুল মজিদ খসরু আংলে এর কাছ থেকে আমার বাবা সম্পর্কে সব! বাবা যে এতো বড় একজন ব্যক্তি ছিলেন ঘূর্ণাক্ষরেও বোঝা যায় নি! তাছাড়া,স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে খসরু আংকেলের এর চোখে ঝরে পড়ছিল একরাশ শ্রদ্ধা সেই সাথে মুগ্ধতা! লেখা চালিয়ে গেলাম! এর পর পেলাম বাবা কে নিয়ে লেখা বই” আব্দুস সালাম এর আমার স্মৃতি বিজড়িত ১৯৭১, পেলাম প্রীতিরাণী দাশ পুরকায়স্থ স্মারক গ্রন্থ”যে ধ্রুপপদ দিয়েছো বাঁধি, যেটাতে বাবার কথা ও লেখা আছে। এখন কথা হলো- আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বলেই এতোগুলো বইতে তাঁর নামটি লিপিবদ্ধ আছে।

যাক এবার আসি মূল প্রসঙ্গে- ১৯৭১ সালে যখন তিনি ক্যাম্প ছেড়ে দেশে আসার উদ্দ্যেশ্যে প্রস্তুত হোন,তখন ক্যাম্প যারা পরিচালনা করতেন তারা আমার বাবাকে সাইন করতে বলেন,বিভিন্ন দেশ থেকে যে সব মালা মাল এসেছে ক্যাম্প এ,ঐ সব পরিত্যক্ত মালা মাল যাতে তাদের আন্ডার এ চলে যায় তার জন্য আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল গণি কে তিন লক্ষ টাকা অফার করেন, ,তখন আমার বাবা এবং আমার বাবার বন্ধু মলয় পুরকায়স্থ টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানালেন! আমার বাবা বলেছিলে তখন, আমাদের দেশ এখন ভঙ্গুর অবস্থায় আছে,এই সব মালা মাল এখন সেখানে পাঠানো উচিত! স্যালুট আমার বাবাকে আবার ও! আমি গর্বিত আমি সেই বাবার কন্যা বলে! এর পর টাকার পরিমাণ ১০লক্ষ করা হয়,কিন্তু আমার বাবা তা নেন নাই! ঐ সময় যারা যারা সাইন করে টাকা নিয়ে দেশে এসেছিলেন তারা আজ টাকার গতিতেই ঘুমোচ্ছেন! নাম বললে আপনারা চিনবেন,কিন্তু এসবের কোনও ডকুমেন্ট নাই,যারা সাক্ষী তারাও আজ কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত! এতো বড় লোভনীয় প্রস্তাব আমার বাবা এক কথায় আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করেছিলেন! তখনই,যাদের রক্তে লোভের বীজ জন্মায় তারা ছোট বড় সব জিনিসের দিকে লালসার দৃষ্টিতে তাকায় এটাই স্বাভাবিক! কোনও না কোনও কারণে এক বার হলেও জিহ্বায় লোল গড়িয়ে পড়ে! কিন্তু আফসোস! আমার বাবার তা হয় নি! আমার বাবার মতো এমনও মুক্তিযোদ্ধারা আছেন যারা এমন লোভ লালসার উর্দ্ধৈ! দেশ স্বাধীন হবার পর… আমাদের এলাকা থেকে গন্যমান্য কিছু ব্যক্তিরা আসেন ” বঙ্গবন্ধুর কাছে একটা বাধ নির্মানের কাজ নিয়ে! সেখানে ছাত্র নেতা হিসেবে আমার বাবাও ছিলেন! আমার বাবা ছিলেন একজন জনপ্রিয় ছাত্র নেতা! এটা বজলুল মজিদ খসরু আংকেল এর কাছ থেকে শুনেছি যখন উনার সাথে দেখা হয়। আব্দুস সামাদ আজাদ তখন বঙ্গবন্ধু কে ইশারা করেন আমার বাবার দিকে আঙ্গুল তোলে,তখন বঙ্গ বন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ” আমার বাবাকে বললেন কি বলার আছে বলার জন্য,তখন আমার বাবা সাহসিকতার সাথে বঙ্গবন্ধুর সামনে দাড়িয়ে বলেছিলেন দেশের দূর্নীতি কমাতে হবে,আপনার লোকদের দূর্নীতি কমাতে হবে! তখন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন কিভাবে তা সম্ভব? ডানে চোর বামে চোর! তোমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছো দেশের জন্য তোমাদের উপর দায়িত্ব দিলাম, তোমরা যেখানেই দূর্নীতি দেখবে সেখানে কঠোর হস্তে দমন করবে,কিছু হলে সোজা আমাকে বলবে! বঙ্গবন্ধু তখন আমার বাবাকে সবার সামনে বুকে জড়িয়ে কোলে তোলে নেন! সাবাস বলে খুশিতে উদ্বেল হয়ে উঠেন! এতো সাহসিকতার সাথে প্রতিটি উচ্চারিত বক্তব্য শোনে তিনি উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন এবং এটাও বললেন সাহসী ছেলে! এর পরদিন… বর্তমানে আওয়ামীলীগ এর একজন লিডার বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য টা নিয়ে পত্রিকায় একটা নিউজ দেন। কতো সাল,কোন পত্রিকা তা বলতে পারবো নির্দিষ্ট করে। শুধু এটাই বলছি শীর্ষ ক্ষমতা হাতে পেয়েও আমার বাবা এই সব ক্ষমতার প্রয়োগ করেন নি! করেন নি অপব্যবহার! নিজের জন্য তৈরি করেন নি বিশাল অট্রালিকা! সামান্য কুটিরও! তৈরি করেন নি টাকার গদিও! এর অনেক পরে… সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত -আমার বাবাকে অফার দেন তিন তলা বিল্ডিং জায়গা সহ শুধু মাত্র উনার দলে নেবার জন্য! আমার বাবা তখনও এক বাক্যে বলেছিলেন- আমার ছেলে যখন বড় হবে তখন বলবে বাবা তুমি বিক্রি হয়ে গেলে টাকার কাছে? তখন তাকে কি জবাব দেব??? না এগুলো কোনও সিনেমার ডায়লগ নয়! এগুলো আমার বাবার মুখ নিসৃত বাণী! যা শোনার পর সাহস যোগায় আমাদের মনে! আমরা সব ধরণের লোভ লালসার উর্ধ্বে ছোট থেকে এখনও! কোনও প্রলোভন আমাদের লোভনীয় করে তুলতে পারেনি আজও!

আমার বাবা যুদ্ধ করেছিলেন দেশের জন্য আর আমি যুদ্ধ করে যাচ্ছি মুক্তিযোদ্ধার ডকুমেন্ট এর জন্য। এক সময় যখন সবাই অস্বীকৃতি জানাতে থাকলো আমার বাবা কোনও কালেই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না, আমার লেখনীর পর থেকে যখন লেখা লেখির মাধ্যমে যখন বের করে নিয়ে আসতে পারলাম আমার বাবা প্রকৃত একজন প্রথম শ্রেনীর মুক্তিযোদ্ধা, তারপর থেকে যতো প্রোগ্রামে আমি উপস্থিত হয়েছি আমাকে মুক্তিযোদ্ধার কন্যা বলে সম্ভোধন করা হয়। এমন কি মুক্তিযোদ্ধার কন্যা হিসেবে বাবা সম্পর্কে বলার জন্য আমাকে নিয়ে ১৬ই ডিসেম্বরে অনুষ্ঠান ও করা হয়েছে! বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল গণির কন্যা বলে সম্ভোধন করা হয় এখন আমাকে,আমার স্বার্থকতা এখানেই! আমি জানি,আমার বাবার আত্মা একটু হলেও আজ তৃপ্ত! আমার যুদ্ধে একটু হলেও আমি সফল,এখানেই আমার পরিতৃপ্তি।

লেখক: কবি,ছড়াকার, সাংবাদিক ও এপ্রেন্টিস ল ইয়ার,সিলেট জজ কোর্ট।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*